হিন্দুত্বের সঙ্গে বাঙালিয়ানা, ‘টেগোর’ থেকে ‘ঠাকুর’ হলেন রবীন্দ্রনাথ—মোদীর ভাষণে বদলের ইঙ্গিত

ব্রিগেড সমাবেশে বিজেপির নতুন কৌশল—হিন্দুত্বের সঙ্গে বাঙালিয়ানা। মোদীর ভাষণে ‘টেগোর’ নয় ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’, মঞ্চে বাংলার সংস্কৃতির উপস্থিতি নিয়ে জোরালো রাজনৈতিক বার্তা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের বিশাল মঞ্চ থেকে শনিবার যে বার্তা দিল বিজেপি, তা শুধু রাজনৈতিক শক্তিপ্রদর্শন নয়—একটি নতুন কৌশলেরও ইঙ্গিত। দীর্ঘদিনের কট্টর হিন্দুত্বের ভাষ্যের সঙ্গে এ বার সমান গুরুত্ব পেল বাঙালিয়ানা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণ, মঞ্চের সাজসজ্জা, এমনকি নেতাদের বক্তব্যেও স্পষ্ট হল—২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের আগে বিজেপি ‘বাঙালি হিন্দু’ পরিচয়কে সামনে এনে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ গড়তে চাইছে।

গত কয়েকটি নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস যে ভাবে ‘বাঙালি অস্মিতা’কে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, তার পাল্টা কৌশল হিসেবেই অনেকের মতে বিজেপি এবার নতুন ভাষা বেছে নিয়েছে। এত দিন পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের নাম উচ্চারণ করতে গিয়ে মোদীর মুখে শোনা যেত ‘টেগোর’। কিন্তু ব্রিগেডের মঞ্চে তিনি বললেন ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ছোট্ট পরিবর্তনই ইঙ্গিত দিচ্ছে বৃহত্তর বার্তার—বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করার প্রচেষ্টা।

হিন্দুত্বের সঙ্গে বাঙালিয়ানা, ‘টেগোর’ থেকে ‘ঠাকুর’ হলেন রবীন্দ্রনাথ—মোদীর ভাষণে বদলের ইঙ্গিত

হিন্দুত্বের সঙ্গে বাঙালিয়ানা, ‘টেগোর’ থেকে ‘ঠাকুর’ হলেন রবীন্দ্রনাথ—মোদীর ভাষণে বদলের ইঙ্গিত

মঞ্চের আঙ্গিকেও ছিল সেই বার্তার প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রীকে রজনীগন্ধার মালা পরিয়ে স্বাগত জানান বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। বাংলার সাংস্কৃতিক আবহকে তুলে ধরতেই শিল্পী সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়ের আঁকা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতিও উপহার দেওয়া হয়। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী মোদীর হাতে তুলে দেন দুর্গাঠাকুরের মূর্তি। মঞ্চের পটভূমিতে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রতিরূপ, এক পাশে বাঁকুড়ার টেরাকোটার শিল্পরীতি, অন্য পাশে চা-বাগানের সংস্কৃতির ছবি—সব মিলিয়ে বিজেপি যেন একসঙ্গে ধর্মীয় আবহ এবং বাঙালি ঐতিহ্যের মেলবন্ধন তুলে ধরতে চাইল।

স্লোগানেও সেই দ্বৈত সুর স্পষ্ট। ‘জয় শ্রীরাম’-এর সঙ্গে মিশে গেল ‘জয় মা কালী’ এবং ‘জয় মা দুর্গা’। বিজেপির নেতারা বারবার তুলে ধরলেন ‘বাঙালি হিন্দু’ পরিচয়ের প্রশ্ন। প্রধানমন্ত্রী মোদী অভিযোগ করলেন, পশ্চিমবঙ্গে জনবিন্যাস দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং তার ফলে বাঙালি হিন্দুরা বিপন্ন হয়ে পড়ছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে এল দেশভাগের স্মৃতি, উদ্বাস্তুদের ইতিহাস এবং নাগরিকত্বের প্রশ্ন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিজেপি বিশেষ করে উদ্বাস্তু অধ্যুষিত এলাকা এবং মতুয়া সমাজের ভোটারদের বার্তা দিতে চেয়েছে।

ব্রিগেডের মঞ্চে শুধু মোদী নন, বিজেপির অন্যান্য নেতাদের বক্তৃতাতেও একই সুর শোনা গেল। অগ্নিমিত্রা পাল থেকে শুভেন্দু অধিকারী—প্রায় সকলেই হিন্দুত্বের পাশাপাশি বাঙালি পরিচয়কে জোর দিয়ে তুলে ধরেন। তৃণমূলের সাম্প্রতিক মন্তব্যের পাল্টা দিয়ে অগ্নিমিত্রা সরাসরি ইতিহাস টেনে এনে বলেন, বাংলার মানুষকে আবার সেই অস্থির সময়ের দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে না।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ধর্মীয় মেরুকরণের যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তার উপর ভিত্তি করেই বিজেপি রাজ্যে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে পরবর্তী নির্বাচনগুলিতে তৃণমূল ‘বাঙালি গরিমা’-কে সামনে এনে সেই মেরুকরণকে অনেকটাই ভেঙে দিয়েছে। ফলে ২০২৬ সালের আগে বিজেপির এই নতুন কৌশল—হিন্দুত্বের সঙ্গে বাঙালিয়ানার মিশেল—রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।

ব্রিগেডে আরেকটি বিষয় চোখে পড়েছে—গ্রামাঞ্চল থেকে আসা মানুষের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। গত লোকসভা নির্বাচনে শহরাঞ্চলে বিজেপি তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও গ্রামবাংলার সমর্থন তৃণমূলের পক্ষেই ছিল। শনিবারের সমাবেশে সেই গ্রামীণ মুখের ভিড় বিজেপির সংগঠনের বিস্তারকেই ইঙ্গিত করছে বলে দাবি পদ্মশিবিরের।

তবে রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, ব্রিগেডের জনসমুদ্র সব সময় ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হয় না। অতীতে বহুবারই বিশাল সমাবেশের পরেও নির্বাচনের ফল ভিন্ন পথে গেছে। তাই শনিবারের এই ভিড় শেষ পর্যন্ত ভোটে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। তবে একথা স্পষ্ট—ব্রিগেডের মঞ্চ থেকে বিজেপি জানিয়ে দিল, কেবল হিন্দুত্ব নয়, বাংলার মাটির সঙ্গেও নিজেদের সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা শুরু করেছে তারা।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত