বিহারের রাজনীতিতে ফের তুঙ্গে উত্তেজনা। ভোটের ফল বেরোতেই সামনে এসেছে এমন এক সমীকরণ, যা পুরো বিহার মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ–চিরাগ পাসওয়ান সমীকরণকে নতুন করে আলোয় এনেছে। মাত্র ২৯টি আসনে লড়ে ১৯টি আসন জিতে এলজেপির বিস্ফোরক উত্থান এবার এনডিএ-র ভেতরেই নতুন চাপ তৈরি করেছে। নির্বাচনের আগেই চিরাগ বলেছিলেন তিনি উপমুখ্যমন্ত্রিত্ব চান। ফল প্রকাশের পর তাঁর দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।
শনিবার বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের সঙ্গে বৈঠক করলেন চিরাগ। কয়েক বছর আগেও যেখানে দুই নেতার সম্পর্ক ছিল উত্তপ্ত, সেখানে এই সাক্ষাৎকে রাজনৈতিক মহল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে দেখছে। ২০২০ সালের নির্বাচনে চিরাগ নীতীশের বিরুদ্ধে লড়ে প্রায় একক শক্তিতে জেডিইউ-কে গোড়ায় কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। তখন এলজেপির ভোটকাটা ভূমিকা নীতীশের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। পরে ২০২৫ নির্বাচনের আগে বিজেপি দুই নেতার সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে উদ্যোগী হয়।
বিহারে মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার, ডেপুটি চিরাগ! তবে নিয়ন্ত্রণ থাকবে বিজেপি-র হাতে।
সেই নীতীশের সঙ্গে আজ চিরাগের সখ্য—এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিহারের আগামী রাজনৈতিক পটভূমিতে চিরাগ পাসওয়ানই ডেপুটি মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন। আর এই সমীকরণে বিজেপির ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
চিরাগ বৈঠকের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে লিখেছেন মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসাসূচক বার্তা। তাঁর ভাষায়, নীতীশ এনডিএর সব শরিক দলের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন এবং এলজেপির প্রার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চিরাগের এই প্রশংসা শুধু সৌজন্য নয়—এটি স্পষ্ট বার্তা যে মুখ্যমন্ত্রী পদে নীতীশকে তিনি মেনে নিচ্ছেন, বদলে তাঁর নিজের উপমুখ্যমন্ত্রিত্ব দাবি আরও শক্ত করতে চাইছেন।

প্রসঙ্গত, বিহারের বিদায়ী মন্ত্রিসভায় দুই উপমুখ্যমন্ত্রীই ছিলেন বিজেপির। এবার চিরাগ ওই পদ চাইলে বিজেপির সেই দুই জায়গা ধরে রাখা কার্যত অসম্ভব। আবার চিরাগকে উপেক্ষা করলেও এনডিএর ভেতর বড় সংকট তৈরি হতে পারে। কারণ বিজেপি–জেডিইউর সম্পর্ক ভবিষ্যতে টানাপোড়েনের মুখে পড়লে চিরাগই হবে NDA-র গুরুত্বপূর্ণ ‘কিংমেকার’।
এই কারণেই বিজেপি এখন অত্যন্ত কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। সূত্রের দাবি, এবারের সরকারে বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী বা উপমুখ্যমন্ত্রী—কোনও পদই নেবে না। বদলে নীতীশ কুমার ও চিরাগ পাসওয়ানকে সামনে রেখে পিছন থেকে নিয়ন্ত্রণ করবে পুরো বিহারের প্রশাসনিক চালচিত্র। অর্থাৎ, সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে নয়, বরং আড়াল থেকে শক্ত অবস্থান নেবে গেরুয়া শিবির।
বিহারের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, চিরাগের উত্থান শুধু এলজেপির শক্তি বাড়ায়নি, বরং নীতীশ ও বিজেপির মধ্যে ভারসাম্য সরাসরি বদলে দিয়েছে। জেডিইউ নেতৃত্ব বুঝছে, চিরাগ এখন আর ‘ছোট শরিক’ নন—তিনি NDA-র অন্দরের শক্তিশালী আলোচক।
এতদিন চিরাগের দাবিকে বিজেপি রাজনৈতিক সৌজন্য হিসেবে দেখলেও, এবার তা বাস্তব চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ১৯টি আসনের জয়ের অর্থ শুধু সংখ্যায় বৃদ্ধি নয়—এটি এনডিএর ভবিষ্যত স্থিতি নির্ধারণকারী একটি বড় শক্তি।
এখন প্রশ্ন একটাই—নীতীশ মুখ্যমন্ত্রী, চিরাগ উপমুখ্যমন্ত্রী—এ সমীকরণ কবে ঘোষণা হবে? এবং এর পর বিজেপির আড়ালের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে সামনে আসবে? বিহারের রাজনীতি আবারও নতুন নাটকীয় অধ্যায়ে প্রবেশ করছে।



