পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR ঘিরে ফের রাজনৈতিক চাপানউতোর। ভোটার তালিকা থেকে ২৭.১৬ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, এই নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিজেপি বা নির্বাচন কমিশনের একতরফা সিদ্ধান্ত নয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছিল।
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, SIR-এর সময় ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁদের মধ্যে ২২.২১ লক্ষের বেশি ভোটার নিজেদের নাম পুনর্বহালের আবেদন করেছেন। প্রায় ৭০০ বিচারবিভাগীয় আধিকারিক এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে কমিশন সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে।
‘২৭ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার দায় মমতার’
রবিবার সাংবাদিক বৈঠকে SIR প্রসঙ্গেই বিরোধীদের আক্রমণ করেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়ের করা মামলার পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের হাতে এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যায়। ফলে নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য বিজেপি বা কমিশনকে দায়ী করা ঠিক নয়—এমনটাই দাবি তাঁর।
তবে SIR-এর পুরো প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ছিল না, এমনটা বলা যায় না। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা প্রায় ৬০ লক্ষ ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতি হিসেবে চিহ্নিত ভোটারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ২৭.১৬ লক্ষ নাম বাদ যায়।
কী হয়েছিল ২৭ লক্ষ নামের ক্ষেত্রে?
SIR-এর সময় প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের নাম নিয়ে যাচাইয়ের প্রয়োজন তৈরি হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট পরবর্তী পর্যায়ে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের দিয়ে ওই মামলাগুলি নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করে। তাঁদের সিদ্ধান্তের পর ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ে।
এরপর বাদ যাওয়া ভোটারদের জন্য আপিলের ব্যবস্থাও করা হয়। নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২৭ লক্ষের মধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশ অর্থাৎ ২২.২১ লক্ষের বেশি ভোটার নাম ফেরানোর আবেদন করেছেন। মোট SIR-সংক্রান্ত আপিলের সংখ্যা ৩৮.৩১ লক্ষের বেশি।
এই মুহূর্তে বিষয়টি নিয়ে আইনি প্রক্রিয়াও চলছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছিল, SIR-সংক্রান্ত মোট ৩৮,২০,৬৮৩টি আপিলের মধ্যে মাত্র ১,০২,২৩১টি নিষ্পত্তি হয়েছে। অর্থাৎ ৩৭ লক্ষেরও বেশি আবেদন তখনও বিচারাধীন ছিল।
মমতার দাবি, নাম ফেরাতে হবে
SIR নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছে তৃণমূল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, যাঁদের নাম বাদ পড়েছে তাঁদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার প্রসঙ্গটি তিনি নির্বাচনী প্রচারেও একাধিকবার তুলেছেন।
এই অবস্থানকে সামনে রেখেই শুভেন্দু অধিকারীর পালটা আক্রমণ। তাঁর বক্তব্য, SIR-এর ফলাফল মেনে নিতে না পেরে তৃণমূল নেতৃত্ব এখন নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির দিকে দায় ঠেলছে।
‘কেরলে ভালো, বাংলায় খারাপ কেন?’
সাংবাদিক বৈঠকে SIR নিয়ে তৃণমূলের অবস্থানকেও কটাক্ষ করেন শুভেন্দু। তাঁর প্রশ্ন, কেরলে SIR ভালো হলে পশ্চিমবঙ্গে একই প্রক্রিয়া খারাপ কেন?
নির্বাচনী ফলের প্রসঙ্গ তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে জনাদেশ মেনে না নেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে TMC-র প্রতীক ও দলের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও কটাক্ষ উঠে আসে।
এগুলি অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক বক্তব্য। SIR-এর প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন এবং আদালতের নথিই পৃথক বিষয় হিসেবে বিবেচ্য।
তৃণমূল-বাম সম্পর্ক নিয়েও আক্রমণ
SIR-এর পাশাপাশি তৃণমূল ও বামেদের সম্পর্ক নিয়েও আক্রমণাত্মক ছিলেন শুভেন্দু। তিনি ‘সিপিএম-তৃণমূলের ভালোবাসা’ বলে কটাক্ষ করেন।
সিপিএম নেতা এম এ বেবি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করেছিলেন—এই প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। এই ফোনের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার যোগ রয়েছে বলে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন শুভেন্দু। তবে এটি তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য; এর কোনও স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্যের মধ্যে নেই।
আগের দিনের সভার প্রসঙ্গ টেনে পালটা জবাব
এর আগে শনিবার শ্রীরামপুরে সভা করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখান থেকে রাজ্য ও কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানানোর পাশাপাশি SIR এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকেও নিশানা করেন তিনি।
মঞ্চ থেকে ‘আজাদি’ স্লোগানও দেন মমতা। সেই বক্তব্যকে সামনে রেখেই রবিবার পালটা রাজনৈতিক আক্রমণে নামেন শুভেন্দু। সিপিএমের সঙ্গে তৃণমূলের সম্ভাব্য সমীকরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ফলে ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি SIR এখন ফের রাজ্য রাজনীতির অন্যতম বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। তবে নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।



