৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাক্ষী হল বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ভোটাভুটিতে বিএনপির প্রবীণ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (Mirza Fakhrul Islam Alamgir) ২৫৫ ভোট পেয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (LDP) কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) অলি আহমদ (Oli Ahmed) পেয়েছেন ৮৮ ভোট। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে দুপুর ২টো থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ভোট চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৩৪৩ জন ভোট দেন এবং ছয় জন ভোটদান থেকে বিরত থাকেন। ভোটের ফল প্রকাশের পরই মির্জা ফখরুলের জয় নিশ্চিত হয়। শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে তাঁর শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে।
এ বারের নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ছিলেন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সমর্থন করেছিল অলি আহমদকে। ভোটের অঙ্কে অবশ্য শুরু থেকেই বিএনপি এবং তার সহযোগী দলগুলির শক্তিশালী সংসদীয় অবস্থান মির্জা ফখরুলকে এগিয়ে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত ফলেও তারই প্রতিফলন দেখা গেল।
৭৮ বছরের মির্জা ফখরুল বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। ১৯৯০-এর দশকে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন তিনি। ২০১৬ সাল থেকে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার পর তিনি দলের মহাসচিব এবং স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই ফল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদরেরও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর তারেক রহমান (Tarique Rahman) প্রধানমন্ত্রী হন। এ বার দলের প্রবীণ নেতা মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হওয়ায় বাংলাদেশের শীর্ষ সাংবিধানিক দুই পদেই বিএনপির প্রভাব আরও স্পষ্ট হল।
এর আগে রাষ্ট্রপতির পদে ছিলেন মহম্মদ শাহাবুদ্দিন (Mohammed Shahabuddin)। স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তিনি গত জুলাইয়ে পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগের পরই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বিএনপি মির্জা ফখরুলকে প্রার্থী করে এবং সংসদীয় ভোটে জয় নিশ্চিত করে।
শাহাবুদ্দিনের বিদায়ের পিছনে শুধুমাত্র স্বাস্থ্যগত কারণ ছিল, নাকি রাজনৈতিক চাপও কাজ করেছিল—তা নিয়ে বাংলাদেশে নানা আলোচনা রয়েছে। তবে তাঁর পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে স্বাস্থ্যগত বিষয়ই সামনে এসেছে। ফলে রাজনৈতিক চাপের দাবিগুলিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
রাষ্ট্রপতি পদটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। রাষ্ট্রপতিই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। ফলে মির্জা ফখরুলের বঙ্গভবনে যাত্রা বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
আরও একটি কারণে এই নির্বাচন ঐতিহাসিক। ১৯৯১ সালের পর এত দিন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এ বার বিএনপির মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী অলি আহমদ মাঠে থাকায় সংসদে সরাসরি ভোটাভুটি হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বহুদলীয় রাজনৈতিক সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছিল।
ভোটের ফল প্রকাশের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধী প্রার্থী অলি আহমদ—দু’জনেই মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এখন শুক্রবার তাঁর শপথের পর বঙ্গভবনে আনুষ্ঠানিক ভাবে নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের অপেক্ষা।



