১৭ মাসের শাসনকাল শেষে প্রশ্নের মুখে ড. মহম্মদ ইউনুসের অর্থনৈতিক নেতৃত্ব—দেশে নতুন করে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ দরিদ্র হয়েছেন, বেকারত্ব বেড়েছে, বিনিয়োগ ও উৎপাদন কমেছে। একদিকে ঋণের পাহাড়, অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধির চাপে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস—এই বাস্তবতার মধ্যেই দায়িত্ব ছাড়লেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, যা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে দেশজুড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারি ঋণ পৌঁছেছে প্রায় ২২ লক্ষ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকায়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই ব্যাংকিং ও বিদেশি উৎস মিলিয়ে আরও প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৮.৫ শতাংশ, কিন্তু মজুরি বৃদ্ধির হার তার নিচে থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে এবং ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।


অর্থনীতির অন্য সূচকগুলিও উদ্বেগজনক। বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৪ শতাংশ থেকে নেমে ২২.৪৮ শতাংশে এসেছে—চার দশকের মধ্যে যা নজিরবিহীন পতন। সরকারি বিনিয়োগ এবং এডিপি বাস্তবায়নও গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। শিল্প উৎপাদন কমেছে, ব্যবসায় আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে পরিস্থিতি আরও জটিল। খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৫.৭৩ শতাংশ—বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি আর্থিক ব্যবস্থার গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে।
যদিও বিদায়ী ভাষণে ড. ইউনুস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছনোর কথা উল্লেখ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দাবি করেছেন, তবুও সমালোচকদের বক্তব্য—এই রিজার্ভ বৃদ্ধির পিছনে রয়েছে আমদানি নিয়ন্ত্রণ, শিল্পে চাপ এবং সাধারণ মানুষের ব্যয় বৃদ্ধির মতো কঠোর পদক্ষেপ।


বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউনুসের কাছে ছিল এক ঐতিহাসিক সুযোগ—রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কার, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি। বরং আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, তাঁর আমলেই নতুন করে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে নেমে গিয়েছেন।
শুধু অর্থনীতি নয়, শাসন ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে। দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, বিনিয়োগ হ্রাস এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক ক্রমশ ঘনীভূত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তাঁর ঘনিষ্ঠ সংস্থাগুলিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় এসে ইউনুসের প্রতি যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ হয়নি। ‘তিন শূন্য’—দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছিলেন, বাস্তবে তার বিপরীত চিত্রই সামনে এসেছে।







