অসমে ভয়াবহ বন্যা আরও ভয়ঙ্কর, মৃত ৭৫, তিন লক্ষের বেশি মানুষ জলবন্দি

অসমে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৫। ৬২২টি গ্রামে ৩ লক্ষের বেশি মানুষ বিপর্যস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি। ত্রাণ ও আর্থিক সহায়তায় একাধিক ঘোষণা রাজ্য সরকারের।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

অসমে (Assam) চলতি বছরের বন্যা ক্রমশ আরও ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও সাতজনের মৃত্যু হওয়ায় রাজ্যে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫। অসম রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ (ASDMA)-এর সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, এখনও ৬২২টি গ্রামের ৩ লক্ষ ৩২ হাজারেরও বেশি মানুষ বন্যার প্রভাবে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি জলের তলায় চলে যাওয়ায় খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

সরকারি তথ্য বলছে, প্রায় ৪৫ হাজার ৩৪১.৯৮ হেক্টর কৃষিজমি এখনও প্লাবিত। লাগাতার বৃষ্টিতে ব্রহ্মপুত্র (Brahmaputra) এবং তার একাধিক উপনদীর জলস্তর বিপদসীমার উপরে থাকায় পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির কোনও লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না। একাধিক জেলায় হাজার হাজার পরিবার ঘরছাড়া হয়ে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন।

সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে শিবসাগর (Sivasagar) জেলায়। এই জেলাতেই বন্যাজনিত মৃত্যুর সংখ্যাও সর্বাধিক বলে জানিয়েছে প্রশাসন। পাশাপাশি গোলাঘাট (Golaghat), জোরহাট (Jorhat), চরাইদেও (Charaideo)-সহ একাধিক জেলা এখনও বন্যার জলে বিপর্যস্ত। বহু গ্রাম কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাস্তা, সেতু, বসতবাড়ি এবং চাষের জমি। গবাদি পশুরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর মিলেছে, যা ভবিষ্যতে কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা (Himanta Biswa Sarma) একাধিক আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করেছেন। বন্যায় মৃতদের পরিবারের জন্য এককালীন ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৯ লক্ষ টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এক লক্ষেরও বেশি পরিবারকে জরুরি ভিত্তিতে ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে, যাতে তাঁরা প্রয়োজনীয় খাদ্য, পোশাক ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে পারেন।

রাজ্য সরকার আরও জানিয়েছে, আগামী ১ অগস্ট থেকে অরুণোদয় প্রকল্পের আওতায় বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। শিবসাগর, গোলাঘাট, জোরহাট এবং চরাইদেও জেলার উপভোক্তারা অতিরিক্ত ২,৫০০ টাকা করে পাবেন। পাশাপাশি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পড়ুয়াদের জন্য বিশেষ Student Grant চালুরও ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে স্কুলে ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় বই, খাতা ও অন্যান্য শিক্ষা সামগ্রী কেনা সম্ভব হয়।

বন্যার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে ইতিমধ্যেই কেন্দ্রের Inter-Ministerial Central Team দুর্গত এলাকা পরিদর্শন শুরু করেছে। তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় আর্থিক সাহায্য ও পুনর্গঠন প্রকল্প নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)-ও অসমের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছে। দুর্গত এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল, ওষুধ এবং জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দিতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এদিকে রাজ্য প্রশাসনের পাশাপাশি জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF), রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (SDRF), সেনা, পুলিশ এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি একযোগে উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলিতে নৌকার মাধ্যমে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ত্রাণ শিবিরে অতিরিক্ত চিকিৎসক দল মোতায়েন করা হয়েছে এবং গবাদি পশুর চিকিৎসার জন্যও পৃথক মেডিক্যাল ক্যাম্প চালু হয়েছে। ত্রাণ পরিবহণে সহায়তা করতে Air India Express অসমগামী কার্গো পরিবহণের খরচ মকুব করেছে।

আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অংশে বিক্ষিপ্ত থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নদীর জলস্তর আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রশাসনের। সেই কারণেই উদ্ধার ও ত্রাণকাজের পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন বিপর্যয়ের মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন