ভারতীয় ক্রীড়ার ইতিহাসে আরও এক অনুপ্রেরণার গল্প লিখলেন ত্রিপুরার জুডোকা অস্মিতা দে (Asmita De)। দক্ষিণ ত্রিপুরার এক সাধারণ পরিবারের মেয়ে, যার বাবা ছিলেন একজন সাইকেল মেকানিক। দারিদ্র্য, সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং বাবার অকালমৃত্যুর মতো কঠিন বাস্তবকে সঙ্গী করেই এগিয়ে গিয়েছেন তিনি। সেই লড়াইয়েরই সেরা পুরস্কার মিলল গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬ (Commonwealth Games 2026)-এ। মহিলাদের ৪৮ কেজি বিভাগে স্বর্ণপদক জিতে শুধু নিজের স্বপ্নই পূরণ করলেন না, ভারতীয় জুডোর ইতিহাসেও যোগ করলেন নতুন অধ্যায়।
মাত্র ২২ বছর বয়সেই অস্মিতা দেখিয়ে দিলেন, প্রতিভার সঙ্গে যদি থাকে কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য মানসিক শক্তি, তবে আর্থিক অনটন কোনও বাধাই হতে পারে না। তাঁর সোনাজয় এখন দেশের ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
দক্ষিণ ত্রিপুরার বেলোনিয়া (Belonia) শহরে জন্ম অস্মিতার। বাবা গণেশ দে জীবিকা নির্বাহ করতেন সাইকেল সারাইয়ের কাজ করে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা কখনও স্বচ্ছল ছিল না। ছোটবেলা থেকেই অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু খেলাধুলার প্রতি প্রবল আগ্রহ এবং পরিবারের উৎসাহ তাঁকে অন্য পথে হাঁটার সাহস দেয়।
স্কুলজীবনেই জুডোর সঙ্গে পরিচয়। প্রথমে সাধারণ খেলাধুলা হিসেবে শুরু হলেও খুব দ্রুতই তাঁর প্রতিভা নজরে আসে প্রশিক্ষকদের। উন্নত পরিকাঠামো কিংবা আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সুযোগ না থাকলেও কঠোর অনুশীলন, শৃঙ্খলা এবং আত্মবিশ্বাসের জোরে ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে থাকেন অস্মিতা।


মহিলাদের ৪৮ কেজি বিভাগে খেলতে শুরু করার পর রাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ে একের পর এক সাফল্য আসে তাঁর ঝুলিতে। ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্সের সুবাদে ভারতীয় জাতীয় জুডো দলে জায়গা করে নেন তিনি। এরপর আন্তর্জাতিক মঞ্চেও দেশের হয়ে নিয়মিত প্রতিনিধিত্ব করতে শুরু করেন।
কমনওয়েলথ গেমসের আগে তাঁর সাফল্যের তালিকায় ছিল এশিয়ান জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপ (Asian Junior Championships)-এ ব্রোঞ্জ, জুনিয়র এশিয়া কাপ (Junior Asia Cup)-এ স্বর্ণ, এশিয়ান ওপেন (Asian Open)-এ রুপোর পদক-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য। জাতীয় পর্যায়েও তিনি দীর্ঘদিন ধরে ৪৮ কেজি বিভাগের অন্যতম সেরা জুডোকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।


তবে সাফল্যের এই পথ মোটেই সহজ ছিল না। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাবাকে হারান অস্মিতা। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েও তিনি ভেঙে পড়েননি। ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে পরিণত করে অনুশীলন চালিয়ে গিয়েছেন নিরন্তর। সেই মানসিক দৃঢ়তারই প্রতিফলন দেখা গেল গ্লাসগোর মাটিতে।
ফাইনালে দুরন্ত পারফরম্যান্স করে স্বর্ণপদক জয়ের পর আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয়। মাত্র কয়েক মাস আগে যাঁকে হারিয়েছেন, সেই বাবার স্বপ্নকেই যেন বাস্তবে রূপ দিলেন ত্রিপুরার এই কন্যা। সাইকেল মেরামতের ছোট দোকান থেকে শুরু হওয়া সংগ্রামের গল্প শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গেল আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার সর্বোচ্চ মঞ্চে।
অস্মিতা দে-র এই সোনাজয় শুধু একটি পদক নয়, এটি ভারতীয় জুডোর জন্য এক নতুন দিগন্ত। একই সঙ্গে হাজারো তরুণ-তরুণীর কাছে বার্তা—স্বপ্ন দেখার সাহস থাকলে সীমাবদ্ধতা কখনও শেষ কথা হতে পারে না।



