একটি কণ্ঠ থেমে গেল, কিন্তু থামল না তার প্রতিধ্বনি। আশা ভোঁসলে-র প্রয়াণে শুধু একজন শিল্পীর নয়, এক বহুরঙা সুরযাত্রার ইতি ঘটল। তাঁর গান মানে শুধু সুর নয়—সময়ের স্মৃতি, আবেগের বিস্তার, আর এক অদ্ভুত ‘মোহ’, যা প্রজন্ম পেরিয়ে আজও অটুট।
আশির দশকের এক মফস্সলের রাত—মাইক বাজছে, মঞ্চে কভার শিল্পীরা গাইছেন, আর ভিড়ের মধ্যে বসে থাকা সাধারণ মানুষ যেন ছুঁয়ে ফেলছেন এক অদৃশ্য জগত। সেই জগতে বারবার ফিরে আসছে আশার কণ্ঠ—‘চুরা লিয়া হ্যায়’, ‘ইয়ে মেরা দিল’, ‘একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও’—একটির পর একটি গান যেন রাত জুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। বাস্তবে তিনি দূরে, তবুও তাঁর কণ্ঠ পৌঁছে যাচ্ছে প্রত্যন্ত জনপদেও, মানুষের অন্তরের গভীরে।



এই জাদুর উৎস কোথায়? হয়তো তাঁর কণ্ঠের বহুমাত্রিকতায়। শাস্ত্রীয় থেকে আধুনিক, গজল থেকে ক্যাবারে—সব ঘরানায় সমান সাবলীল ছিলেন তিনি। রাহুল দেব বর্মণ-এর সুরে তাঁর গান যেন এক নতুন সাউন্ডস্কেপ তৈরি করেছিল—যেখানে পরীক্ষানিরীক্ষা আর আবেগ মিলেমিশে তৈরি করেছিল এক অনন্য সুরভুবন।
‘দম মারো দম’ থেকে ‘পিয়া তু আব তো আ যা’, আবার ‘ইন আখোঁ কি মস্তি’—প্রতিটি গানে তিনি নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়েছেন। সময় বদলেছে, সুরের ভাষা বদলেছে, কিন্তু তিনি থেকে গেছেন প্রাসঙ্গিক। এমনকি এ আর রহমান-এর সুরেও পরবর্তী প্রজন্মকে মুগ্ধ করেছেন একই সহজতায়।



বাংলাতেও তাঁর অবাধ বিচরণ। ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’ বা ‘আজ যাই, আসব আরেক দিন’—এসব গান আজও পুজোর প্যান্ডেলে অনিবার্য। বাঙালি শ্রোতা তাঁকে কখনও ‘বাইরের’ শিল্পী হিসেবে ভাবেনি, বরং নিজেরই একজন মনে করেছে।
ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্কের টানাপোড়েন, ইন্ডাস্ট্রির গুঞ্জন—সব কিছুর মধ্যেও তিনি ছিলেন একটাই—‘আশা’। তাঁর কণ্ঠে ছিল আকর্ষণ, আবেশ, আর এক অদ্ভুত স্বাধীনতা, যা কোনও গণ্ডিতে আটকে থাকেনি।
জীবনের শেষ পর্বে কণ্ঠ নীরব হয়ে এলেও, তাঁর গান থামেনি। কারণ, তিনি শুধু গান গাইতেন না—তিনি এক অনুভূতি তৈরি করতেন, যা মানুষকে বারবার টেনে নিয়ে যায় স্মৃতির ভেতরে।
আজ তিনি নেই। কিন্তু কোথাও না কোথাও, কোনও এক রাতের মঞ্চে, কোনও এক মানুষের মনে, আবার বাজবে—
“আভি না যাও ছোড় কর…”
আর সেই সুরেই বেঁচে থাকবেন আশা ভোঁসলে—মোহের অন্য নাম হয়ে।
সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে
Google News এবং Google Discover-এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।



