মানস দেঃ ২০২১ এর বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল কেন এমন হলো বুঝতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে ২০১৬-র বিধানসভা ভোটের ফলাফলের পরবর্তী সময়ে এবং ২০১৯ এর লোকসভা ভোট। ২০১৬ সালের ভোটের বাম এবং কংগ্রেস জোটের মুল ইস্যু ছিলো রাজনৈতিক সন্ত্রাস, বেকার সমস্যা, দুর্নীতি, চিটফান্ড এবং হাতে গরম ইস্যু নারোদা কেলেঙ্কারি, বিরোধী জোটের প্রধান মুখ ছিলেন সূর্যকান্ত মিশ্র এবং শাসক দলের প্রধান মুখ ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
আরও পড়ুনঃ বাংলার কৃষক ভাইদের ১৮ হাজার টাকা কই? জবাব চেয়ে মোদীকে চিঠি মমতার
২০১৬-য় ভোটের ফলাফল হয়েছিলো তৃণমূল – ৪৪.৯% আসন সংখ্যা ২১১ টি বাম এবং কংগ্রেস জোট – ৩৭.৯ % আসন সংখ্যা ৭৬টি বিজেপি – ১০.৯ % আসন সংখ্যা ৩টি এবং গজমুমু ৩টি আসন ও নির্দল ১টি আসন অর্থাৎ ২০১৬-র ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে ৪৫% মানুষের উপর দুর্নীতি এবং সন্ত্রাস প্রভাব ফেলে নি তারা শাসক দলের উপর ভরসা রেখেছিলেন। ২০১৬-র নির্বাচনে বাম কংগ্রেস জোট হেরে যাওয়ার পর তাদের কর্মী সমর্থকদের হতাশ হয়ে যাওয়া এবং নেতৃত্বের শীতল মনোভাবের সুযোগে আসরে নেমে পড়লো বিজেপি একে তারা কেন্দ্রে ক্ষমতাসিন তার উপর অগাধ অর্থ এই দুটোকে কাজে লাগিয়ে তারা শাসক বিরোধী মানুষদের বোঝাতে লাগলো বাম কংগ্রেসকে দিয়ে হবে না তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে সরাতে গেলে তাদের হাত ধরতে হবে, এছাড়াও বিজেপির আর একটি অস্ত্র যেটা তারা গোবলয়ে ব্যবহার করে চুড়ান্ত সফল সেই হিন্দুত্বের অস্ত্র প্রয়োগ শুরু করে দিলো।
চিটফান্ডে সর্বস্বান্ত, বেশ কিছু এলাকায় তোলাবাজিতে ( যেটা সংবাদ মাধ্যমে শাসক দলের নেতা নেত্রীরা পরোক্ষে স্বীকার করেছিলেন ) অতিষ্ট বিপুল সংখ্যক মানুষ ক্রমশঃ বিজেপির দিক ঝুঁকতে লাগলেন আর প্রবল হিন্দুত্বে বিশ্বাসী মানুষতো ছিলেনই যার ফল ফলতে শুরু করলো স্থানীয় পৌরসভা নির্বাচন, উপ নির্বাচন এবং পঞ্চায়েত নির্বাচনে, এইসব নির্বাচনে দেখা গেলো বিজেপি ক্রমশঃ বাম কংগ্রেস জোটকে পেছনে ফেলে তারা দ্বিতীয় স্থানে জায়গা করে নিয়েছে অর্থাৎ তৃণমূলের বিকল্প হিসাবে নিজেদেরকে তুলে ধরেছে। ২০১৯ এর লোকসভা ভোটে বিজেপি তাদের সমস্ত শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো সঙ্গে পেলো তৃণমূল ছেড়ে আসা তৃণমূলেরই দ্বিতীয় প্রধান মুকুল রায় সহ বেশ কিছু নেতা নেত্রী, রাজ্যের ৪২ টি আসনের মধ্যে ৪০ টি আসনে তারা কড়া টক্কর দিলো তৃণমূলকে বিজেপি ২০১৬-র ১০.২ % ভোটের থেকে প্রায় ৪০% ভোটে পৌঁছে গেলো তাদের লোক সভায় আসন সংখ্যা এক ধাক্কায় হলো ১৮টি তৃণমূলের ভোট নেমে গেলো ৪৪.৯% থেকে ৩৯.৭%তে আসন সংখ্যা – ২২ বামেদের ভোট নেমে গেলো ২৫.৬% থেকে ৭.৫ % আসন সংখ্যা – ০ কংগ্রেস ১২.৩% থেকে নেমে গেলো ৫.৫% তে আসন সংখ্যা – ২ ( ২০১৯-শে বাম কংগ্রেস জোট আলাদা ভাবে লড়াই করে ২০১৬-র তুলনায় হারিয়েছিল ২৪.৯% ভোট।
২০১৯ শের লোকসভার আসন অনুযায়ী বিধান সভা ভিত্তিক ফলাফলে বিজেপি এগিয়েছিলো ১২১টি আসনে এবং তৃণমূল এগিয়েছিল ১৬৪ টি আসনে। বিজেপি ভাবা শুরু করে দিলো ২০২১শে ক্ষমতায় আসা তাদের শুধু মাত্র সময়ের অপেক্ষা দিল্লি নেতৃত্বও বুঝে গেলো ২১সে তারা ক্ষমতায় আসতে চলেছে, শুরু হয়ে গেলো বাংলা দখলের পরিকল্পনা। তৃণমূল তখন প্রশান্ত কিশোরকে নিয়ে এসে ২০২১ এর ভোটের পরিকল্পনা শুরু করলো আর সারা দেশে কংগ্রেস ব্যাপক ধাক্কা খেয়ে এবং বামেদের ভোট ৭.৫%য় নেমে যাওয়াতে তারা বেশ খানিকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো, ২০১৯শে কেন্দ্রে বিজেপির এক বছর শাসন পূর্তির আগেই ২০২০ র মার্চে সারা বিশ্বব্যাপী শুরু হয়ে গেলো ভয়ঙ্কর মহামারী করোনা ভারতে এর প্রভাব পড়লো সাংঘাতিক ভাবে, দেশের স্বাস্থ ব্যবস্থার করুন অবস্থা মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পেলো, বহু মানুষ মৃত্যু বরণ করলো অপরিকল্পিত লকডাউনের ফলে পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশার আর সীমা রইলো না বহু পরিযায়ী শ্রমিক ঘরে ফেরার পথে নৃশংস ভাবে মারা গেলো অনেক মানুষ অনাহারে মারা গেলো।
২০২১ বিধানসভার ফলাফল বিশ্লেষণ, কয়েক কোটি মানুষ তাদের রুজি রোজগার হারালো কেউ কেউ আবার অভাবে এবং কাজ হারিয়ে আত্ম হত্যার পথ বেছে নিলো, ভুক্তভোগী অসহায় মানুষের কেন্দ্রের শাসক দলের উপর বিতৃষ্ণা জন্ম নিলো ঠিক ওই সময় বেশ কিছু জায়গায় বামেরা সর্ব সাধারণের জন্য কমিউনিটি কিচেন খুলে, রেড ভলেন্টিয়ার তৈরী করে মানুষের বাড়িতে গিয়ে তাদের সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করে নিজেদের হারানো মনবল বেশ খানিকটা ফিরে পেলো এবং বেশ কিছু মানুষের কাছে গ্রহন যোগ্য হয়ে উঠলো, তৃণমূল কংগ্রেস শুরু করেদিলো সারা বাংলা জুড়ে স্বাস্থ সাথী কার্ড ( যদিও এ প্রকল্পটি তারা আগে কিছু কিছু জায়গায় শুরু করলেও মাঝে বন্ধ ছিলো ), কেন্দ্রীয় সরকারের তিন মাসের করোনা কালীন রেশন ব্যবস্থা চলে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও তৃণমূল সরকারের বিনা মূল্যে রেশন ব্যবস্থাটি চালু রাখা, একাদশ দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র ছাত্রীদের ট্যাব বাবদ ১০০০০ টাকা দেওয়া, প্রত্যত্ন গ্রামের দিকে রাস্তার উন্নতি করা।
বিজেপি তখন বাংলায় ব্যাস্ত ২১শের ভোটের পরিকল্পনা নিয়ে কারন তারা জানতো তাদের পক্ষে ২৯৪ টি আসনে প্রার্থী দেওয়া ভীষণ কঠিন কাজ, শুরু হয়ে গেলো বিজেপি বিরোধী দলগুলি থেকে বিধায়ক, কাউন্সিলর ও নেতা নেত্রীদের আমন্ত্রণ একাজে তারা সফলতাও পেলো বামেদের থেকে সামান্য সংখ্যক বিজেপিতে গেলেও তৃণমূল থেকে ব্যাপক অংশের নেতা নেত্রী বিধায়ক বিজেপিতে যোগদান করলো এবং প্রায় অর্ধেক আসনে এদের প্রার্থী করে দেওয়া হলো, বিজেপি নেতৃত্ব একবারও ভাবলো না এদের মধ্যে অনেকের নামে দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় মানুষ এবং তাদের নিচু তলার কর্মীরা ভয়ানক ক্ষুদ্ধ হতে পারে তারা একবারও ভাবলো না এটা একটা সাংঘাতিক হটকারী সিদ্ধান্ত ! বিজেপি নেতাদের NRC CAA নিয়ে লাগাতার প্রচার, উগ্র হিন্দুত্বের প্রচার যেটা কিনা গোবলয়ে সফল হলেও বাংলায় যে এর বিরূপ মনোভাব হবে সেটা বুঝতেও পারেনি তারা।
২০১৯ শে লোক সভার ভোটে মিরাকেল ফলের পর তারা ভেবেছিলো ক্ষমতা হাতের মুঠোয় যার দরুন নিচু তলার বেশ নেতার উগ্র আচরণ, উপর তলার কয়েকজন নেতার তুমুল বিতর্কিত উস্কানিমূলক মন্তব্য, হুমকি যেমন ‘ বুদ্ধিজীবীদের রগড়ে দেবো ‘ ‘ শীতলকুচিতে ৪টে গুলি কেনো মিস হলো ৪ জনের জায়গায় 8জন মরা উচিত ছিলো ‘ ‘ জায়গায় জায়গায় শীতলকুচি হবে ‘ এসব মন্তব্যে মানুষ আতঙ্কিত হয়েছে ক্রুদ্ধ হয়েছে এছাড়া দেশের মানুষ যখন চরম অর্থনীতিক সংকটে রয়েছে জীবন জীবিকা খাদের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে সেই সময় পেট্রল, ডিজেল, রান্নার গ্যাস, ভোজ্য তেলের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি মানুষ সহ্য করতে পারে নি, নির্বাচনের দিন ঠিক হয়ে যাওয়ার অনেক আগে থেকেই বাংলার বাইরে অবাঙালি রাজ্যের নেতাদের নিয়ে এসে সভা সমিতিতে বিতর্কিত মন্তব্য করা অনেকের নাপসন্দ হয়েছে এবং এই ব্যাপরটা তৃণমূল ক্যাশ করে ‘ বাংলায় নিজের মেয়েকেই চায় ‘ ও ‘ বহিরাগত ‘ স্লোগানটি ব্যাপক ভাবে প্রচার করেছে। সংযুক্ত মোর্চার পক্ষে কেন বিজেপির প্রতি মানুষের ক্ষোভের সুযোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি তার বেশ কিছু কারন ব্যাখ্যা করা যায় – সংযুক্ত মোর্চা যোগ্য একজন নেতা যাকে দেখে মানুষ তৃণমূল বিরোধী বিকল্প নেতা ভাবতে পারে সেরকম কোনো নেতাকে প্রজেক্ট করতে পারেনি যদিও বিজেপিও তেমন কোনও নেতা প্রজেক্ট করতে পারে নি।
২০২১ বিধানসভার ফলাফল বিশ্লেষণ, সংযুক্ত মোর্চা যার মধ্যে ISF একদম নতুন একটি দল বাকি বাম এবং কংগ্রেসের উপর মানুষ ভরসা রাখতে পারেনি ( ভোটের ফল তাই বলছে ) তার কারন প্রথম সারির মিডিয়ার বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে লড়াইকে হাইলাইট করা যেটা দিল্লি থেকে লাগাতার প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সহ ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের ডেইলি প্যাসেঞ্জারী করে বাংলায় এসে নির্বাচনে প্রচার করে মান্যতা দিয়েছে অথচ বাম এবং কংগ্রেসের দিল্লির প্রথম সারির নেতাদের বাংলায় প্রচার করতে দেখা যায়নি যার দরুন বিজেপির কর্মকান্ডে অসন্তুষ্ট মানুষ তৃণমূলকেই বেছে নিয়েছে বিশেষ করে NRC, CAAর ফলে পার্শবর্তী রাজ্যে প্রায় ১৯ লক্ষ বাঙালি নাগরিকত্ব হীন হওয়াতে এ রাজ্যের প্রচুর সংখ্যক মানুষ শঙ্কিত হয়ে সংযুক্ত মোর্চার জ্বলন্ত ইস্যু যেমন বেকার সমস্যা, দুর্নীতি, রাজ নৈতিক সন্ত্রাসকে গুরুত্ব না দিয়ে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে।
বাম বা কংগ্রেসকে মনে রাখতে হবে তাদের উপর রাগ বা ক্ষোভের কারনে তাদের ভোট দেয়নি তা নয় তারা চেয়েছে আপাতত তাদের নাগরিকত্ব ইস্যু এবং সাম্প্রদায়িক ইস্যুর থেকে বাঁচতে গেলে তাঁদের ভোট দিয়ে ভোট কেটে বিজেপির সুবিধা করে দেওয়ার থেকে তৃণমূলকে ভোট দিয়ে বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে হবে কারন বাংলার বেশিরভাগ মানুষ আজও উগ্র সাম্প্রদায়িকতাকে ঘৃণা করে ভোট শুরুর আগে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সাথে কথা বলে যেটুকু বোঝা গেছে তারা বামেদের পছন্দ করছে কিন্তু তাদের এই অশান্ত অবস্থায় বামেদের বিকল্প হিসাবে ভাবতে পারছে না প্রচুর মানুষ বামেদের নতুন প্রজন্মকে পছন্দ করছে কিন্তু এ বারের ভোটে তারা কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না কারণ এবারের ভোট সরাসরি দু দিকে ভাগ হয়ে গেছে হয় বিজেপি নাহয় বিজেপি বিরোধী তৃণমূল মাঝে কোনো রাস্তা নেই যার উদাহরণ ভোটের ফলাফল – পরিশেষে একটা কথা না বললেই নয় NRC, CAA, বাঙালিয়ানা, মমতা বন্দোপাধ্যায়কে ব্যক্তিগত ভাবে আক্রমন ( এরাজ্যে এবার ৪৯% মহিলা ভোটার ছিলেন একজন মহিলা হয়ে আর একজন মহিলাকে লাগাতার ব্যক্তিগত আক্রমণ কখনোই মেনে নিতে পারেন না যার ফল স্বরূপ মহিলাদের বেশিরভাগ ভোট এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝুলিতে গিয়েছে ), দল বদলুদের বিজেপিতে প্রাধান্য দেওয়া এবং নেতাদের উগ্র মন্তব্য এবারের ভোটে বিজেপিকে ক্ষমতার দখল থেকে শত যোজন দূরে রেখেছে।
( তথ্য সূত্র – নির্বাচন কমিশন ওয়েব সাইট , টাইমস অফ ইন্ডিয়া, এন ডি টিভি, নজর বন্দি ওয়েব পোর্টাল )



