নিউটাউনে আদানি গোষ্ঠীর ২০০০ শয্যার হাসপাতাল তৈরির ঘোষণা নিঃসন্দেহে রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর জন্য বড় খবর। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, হাসপাতালের ১০০০টি বেড দরিদ্র রোগীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। ঘোষণাটি মানবিক এবং ইতিবাচক শোনালেও, তার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে ইতিমধ্যেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হল— ‘দরিদ্র’ কাদের বলা হবে? একজন রোগী কীভাবে প্রমাণ করবেন যে তিনি এই সংরক্ষিত পরিষেবার যোগ্য? শুধুমাত্র মুখের কথায়, না কি কোনও সরকারি নথির ভিত্তিতে এই সুবিধা মিলবে? এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে সরকার বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার পক্ষ থেকে কোনও স্পষ্ট নির্দেশিকা সামনে আসেনি।
ভারতের বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পে সাধারণত আয়, সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা কিংবা নির্দিষ্ট সরকারি কার্ডের ভিত্তিতে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হয়। যেমন, আয়ুষ্মান ভারত, স্বাস্থ্যসাথী বা অন্যান্য কল্যাণমূলক প্রকল্পে নির্দিষ্ট যোগ্যতার শর্ত থাকে। কিন্তু এই হাসপাতালের ক্ষেত্রে সেই ধরনের কোনও মানদণ্ড থাকবে কি না, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
আরও একটি বাস্তব প্রশ্ন উঠে আসছে। যদি প্রতিদিন বহু রোগী নিজেদের দরিদ্র বলে দাবি করেন, তাহলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কীভাবে যাচাই করবে? আধার কার্ড, রেশন কার্ড, আয় শংসাপত্র, স্বাস্থ্যসাথী কার্ড, নাকি অন্য কোনও সরকারি নথি দেখাতে হবে? কোনও যাচাই ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে অপব্যবহারের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে বেসরকারি হাসপাতালে দরিদ্রদের জন্য শয্যা সংরক্ষণের উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে সেই উদ্যোগ সফল করতে হলে শুরু থেকেই স্বচ্ছ, লিখিত এবং সর্বজনগ্রাহ্য নীতিমালা প্রকাশ করা জরুরি। নচেৎ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, রোগী এবং সরকারের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
আরও একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। এই ১০০০ শয্যার রোগীরা কি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা পাবেন, নাকি নির্দিষ্ট কিছু পরিষেবাতেই ছাড় থাকবে? ওষুধ, অস্ত্রোপচার, আইসিইউ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা— সবকিছু কি অন্তর্ভুক্ত হবে? নাকি শুধুমাত্র বেডের খরচে ছাড় মিলবে? এই বিষয়েও এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
ঘোষণা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু জনস্বার্থে ঘোষণার পাশাপাশি প্রয়োজন স্পষ্ট নীতিমালা। কারণ স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা ভবিষ্যতে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। তাই ভূমিপুজোর আগেই যদি সরকার বা আদানি গোষ্ঠী যোগ্যতার মানদণ্ড, প্রয়োজনীয় নথি, সুবিধার পরিধি এবং আবেদন প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশ করে, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বাড়বে।
(এই প্রতিবেদনটি উপলব্ধ সরকারি ঘোষণার ভিত্তিতে তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ। ‘দরিদ্র’ নির্ধারণের কোনও সরকারি নির্দেশিকা এখনও প্রকাশিত হয়নি। ভবিষ্যতে সরকার বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক নীতিমালা প্রকাশ করলে সেই তথ্য অনুযায়ী বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।)



