নয়াদিল্লির নির্বাচন সদনে বুধবার যা ঘটল, তা শুধু একটি বৈঠকের বিবরণ নয়—এটি আসন্ন রাজনৈতিক সংঘাতের স্পষ্ট ইঙ্গিত। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার-এর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ালেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বৈঠক শেষে প্রকাশ্যে অভিষেকের বক্তব্যে যে তীব্রতা ধরা পড়ে, তা বিরল—তিনি প্রকাশ্যেই কমিশনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন এবং আড়াই ঘণ্টার বৈঠকের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের দাবি তোলেন।
বৈঠক দীর্ঘ হবে—এমন ধারণা তৃণমূলের অনেক প্রতিনিধিরই ছিল না। সন্ধ্যার কলকাতাগামী ফ্লাইট ধরতে কয়েক জন সাংসদকে কার্যত দৌড়ে বিমানবন্দরে পৌঁছতে হয়। কিন্তু বৈঠকের দৈর্ঘ্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে উত্তাপ। অভিষেকের অভিযোগ, কমিশনের তিন সদস্য উপস্থিত থাকলেও কার্যত একাই কথা বলেছেন জ্ঞানেশ কুমার; তৃণমূলের বক্তব্য শুরু হতেই তা থামানোর চেষ্টা হয়েছে। অভিষেকের ভাষায়, উঁচু গলায় কথা বলার সময় জ্ঞানেশ তাঁর দিকে আঙুল তুললে তিনি সাফ জানিয়ে দেন—“আঙুল নামিয়ে কথা বলুন। আপনি মনোনীত, আমি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত।”
তৃণমূল সূত্রে দাবি, বৈঠকে অভিষেক সরাসরি জ্ঞানেশকে বিজেপির ‘দালাল’ বলেও আক্রমণ করেন। এসআইআর আতঙ্কে মৃত্যুর অভিযোগের প্রসঙ্গ তুললে জ্ঞানেশ জানান, বিষয়টি তাঁর জানা। এমনকি তাঁর ‘হাতে রক্ত লেগে আছে’—এই প্রচারও তাঁর কানে পৌঁছেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সাধারণত সংবাদমাধ্যমের সামনে সংযত অভিষেক এ দিন সেই সংযম রাখেননি। নির্বাচন সদনের সামনে দাঁড়িয়ে কমিশনকে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, তৃণমূল তোলা ১০টি প্রশ্নের অধিকাংশেরই জবাব দিতে পারেননি জ্ঞানেশ। তাঁর দাবি, ক্ষমতা থাকলে বৈঠকের সম্পূর্ণ সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করুক কমিশন।
এসআইআর ঘিরে তৃণমূলের অভিযোগের তালিকা এ দিন দ্বিগুণ হয়েছে। এক মাস আগে পাঁচটি প্রশ্ন তুলেছিল দলটি; এ বার প্রশ্ন ১০টি। খসড়া তালিকা প্রকাশের দিনই কী ভাবে ১ কোটি ৩৬ লক্ষ নাম ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ তালিকায় পড়ল—এই প্রশ্নের জবাব চান অভিষেক। তাঁর দাবি, দেড় মাস ধরে প্রায় এক লক্ষ কর্মী দিয়ে এসআইআর চলার পর এক দিনে এত বড় সংখ্যা কী ভাবে চিহ্নিত হল, তার ব্যাখ্যা কমিশন দিতে পারেনি। সেই সঙ্গে ওই ১ কোটি ৩৬ লক্ষের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ না করার বিষয়েও আপত্তি তোলেন তিনি—তাঁর কথায়, “এখানেই ভোটচুরির চাবিকাঠি লুকিয়ে।”
গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ ওঠে এসআইআরের প্রযুক্তিগত দিক নিয়েও। অভিষেক জানান, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরের কাজে গুজরাতের একটি বেসরকারি আইটি সংস্থা যুক্ত রয়েছে। কমিশন প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করলেও অভিষেক তথ্যপ্রমাণ দেওয়ার কথা বলেন। সেই সংস্থার মাধ্যমেই আইডি-পাসওয়ার্ড ‘বৈধ’ করে নাম বাদ দেওয়ার খেলা চলছে—এমন অভিযোগও তোলেন তৃণমূল নেতৃত্ব। পাশাপাশি, লিখিত নির্দেশিকা না দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নির্দেশ পাঠানোর প্রবণতাকেও তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন অভিষেক—তাঁর যুক্তি, লিখিত হলে তা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলেই কমিশন তা এড়াচ্ছে।
বিএলএ-দের প্রবেশাধিকার নিয়েও সংঘাত চরমে। কমিশন শুনানিকেন্দ্রে বিএলএ ঢুকতে দেবে না—এই অবস্থানে অনড়। তৃণমূলের পাল্টা হুঁশিয়ারি, লিখিত নির্দেশিকা না এলে শুনানিতে বিএলএ থাকবেই। ইতিমধ্যেই একাধিক জায়গায় সেই দাবি ঘিরে শুনানি বন্ধ হয়েছে। অভিষেকের স্পষ্ট বার্তা—বাধা দিলে সংঘাত অনিবার্য।
পশ্চিমবঙ্গের বাইরে গুজরাত, তামিলনাড়ু, কেরল, উত্তরপ্রদেশ ও ছত্তীসগঢ়েও এসআইআর চলছে—সেখানে নাম বাদ পড়ার হার বেশি হলেও ‘মাইক্রো অবজার্ভার’ নিয়োগ হচ্ছে কেন শুধু বাংলায়, সেই প্রশ্নও তোলেন অভিষেক। কমিশনের যুক্তি—রাজ্য পর্যাপ্ত অফিসার দেয়নি। তৃণমূল পাল্টা রাজ্যের অব্যবহৃত অফিসারদের তালিকা তুলে দেয় কমিশনের হাতে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতারা—ডেরেক ও’ব্রায়েন, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সাকেত গোখলে, মমতাবালা ঠাকুর, নাদিমুল হক, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ রাজ্যের তিন মন্ত্রী। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচন সদনের এই মুখোমুখি সংঘাত শুধু প্রশাসনিক মতবিরোধ নয়—এটি বাংলার রাজনীতিতে আসন্ন বৃহত্তর লড়াইয়ের ট্রেলার।






