ছোটো পাথরও কত বিপজ্জনক বোঝেন?’ অভিষেকের নিরাপত্তা প্রত্যাহার নিয়ে হাইকোর্টের প্রশ্নের মুখে কেন্দ্র-রাজ্য

নিরাপত্তা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী একাধিক হামলার অভিযোগ নিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মামলায় রাজ্যের কাছে রিপোর্ট চাইল কলকাতা হাইকোর্ট।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

‘হোমগার্ড ছাড়া কার্যত আর কোনও নিরাপত্তা নেই’—এই অভিযোগ তুলে নিরাপত্তা পুনর্বহালের দাবিতে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার সেই মামলার শুনানিতে রাজ্যের কাছে রিপোর্ট চাইল আদালত। বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের নির্দেশ, অভিষেকের নিরাপত্তা কমানোর সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে রাজ্যকে রিপোর্ট দিতে হবে। মামলার পরবর্তী শুনানি ১৩ অক্টোবর।

মামলার শুনানিতে অভিষেকের পক্ষে সওয়াল করেন আইনজীবী শঙ্করনারায়ণ। তাঁর বক্তব্য, ২০১৩ সালে অভিষেককে ‘Y’ ক্যাটাগরির নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল। ২০১৪ সালে তা ‘Y+’, ২০১৫ সালে ‘Z’ এবং ২০১৬ সালে ‘Z+’ করা হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর আচমকাই সেই নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে আদালতে দাবি করেন তিনি।

আইনজীবীর অভিযোগ, ১০ মে কোনও নোটিস ছাড়াই ‘Z+’ নিরাপত্তা তুলে নেওয়া হয়। এরপর নিরাপত্তার মাত্রা এক ধাক্কায় কমিয়ে মাত্র দু’জন নিরাপত্তারক্ষী দেওয়া হয়েছিল বলেও আদালতে দাবি করা হয়। অভিষেকের আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা কমানোর মাত্র ১৯ দিনের মাথায় সোনারপুরে তাঁর উপর হামলার ঘটনা ঘটে।

আদালতে অভিষেকের আইনজীবী দাবি করেন, সোনারপুরের ঘটনার পরও একাধিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা ঘটেছে। বিমানবন্দরেও তাঁকে আক্রমণের চেষ্টা হয়েছিল বলে আদালতে দাবি করা হয়। ওই ঘটনায় এক হামলাকারীর হাতে রিভলভার ছিল বলেও আইনজীবী উল্লেখ করেন।

এ ছাড়াও ডায়মন্ড হারবার এবং ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেকের কার্যালয়েও হামলার অভিযোগ আদালতে তোলা হয়। তাঁর চোখে অতীতে গুরুতর আঘাতের ঘটনাও ঘটেছে বলে আদালতকে জানান অভিষেকের আইনজীবী।

তাঁর বক্তব্য, আগে থেকে নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার কথা জানানো সত্ত্বেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি। এই পরিস্থিতিতেই অভিষেকের জন্য পুরনো নিরাপত্তা কাঠামো ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।

এর আগে ২৮ সেপ্টেম্বরও মামলাটি আদালতে ওঠে। সেই সময় অভিষেকের আইনজীবী জানিয়েছিলেন, বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ‘Z+’ নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তার পর একাধিক নিরাপত্তাজনিত ঘটনা ঘটেছে। বিচারপতি কৃষ্ণা রাও ৬ অক্টোবর মামলাটি শুনানির জন্য নির্ধারণ করেছিলেন।

বিচারপতির প্রশ্ন, ‘নিরাপত্তা প্রত্যাহারের নির্দেশ কোথায়?’

মঙ্গলবারের শুনানিতে নিরাপত্তা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি কৃষ্ণা রাও। আদালতের পর্যবেক্ষণ, এত দ্রুত নিরাপত্তা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হল, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

বিচারপতি জানতে চান, নিরাপত্তা প্রত্যাহারের নির্দেশ কোথায়? একই সঙ্গে চারটি হামলার ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এর দায় কে নেবে। পাথর ছোড়ার ঘটনায় আরও গুরুতর পরিণতি হলে তার দায়ভার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি।

তবে আদালত এখনও নিরাপত্তা পুনর্বহালের বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়নি। বরং রাজ্যের বক্তব্য ও নিরাপত্তা কমানোর সিদ্ধান্তের নথি খতিয়ে দেখার পথেই এগিয়েছে মামলা। সেই কারণেই রাজ্যের কাছে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর অভিষেকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ৭ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়ার কথা জানা যায়। তাঁর হরিশ মুখার্জি রোডের বাড়ির বাইরে থাকা লাগেজ স্ক্যানার, ডোর-ফ্রেম মেটাল ডিটেক্টর, ব্যারিকেড এবং অতিরিক্ত CCTV ব্যবস্থাও সরানো হয়েছিল।

তবে সেই সময় রাজ্যের তৎকালীন পুলিশ প্রধানের বক্তব্য ছিল, অভিষেক ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘Z+’ নিরাপত্তাপ্রাপ্ত হিসেবেই থাকছেন এবং নিয়ম অনুযায়ী নিরাপত্তা বজায় থাকবে। শুধু অতিরিক্ত কিছু ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছিলেন।

পরবর্তী সময়ে অভিষেকের দাবি, তাঁর মূল নিরাপত্তা কাঠামোও কার্যত কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই এবার হাইকোর্টে মামলা করেছেন তিনি। ২৮ সেপ্টেম্বর আদালতে মামলা দায়েরের অনুমতি দিয়ে বিচারপতি কৃষ্ণা রাও ৬ অক্টোবর শুনানির দিন নির্ধারণ করেছিলেন।

নিরাপত্তা কমানোর অভিযোগের পাশাপাশি অভিষেকের বাড়ির সামনে থাকা পুলিশ কিয়স্ক সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও মামলার প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছে। মে মাসেই তাঁর বাড়ির বাইরে থাকা অতিরিক্ত পুলিশি পরিকাঠামোর বেশ কিছু অংশ সরিয়ে নেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

এখন হাইকোর্টের নজর মূলত নিরাপত্তা প্রত্যাহারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দিকে। রাজ্য কী রিপোর্ট দেয় এবং সেই রিপোর্টে নিরাপত্তা কমানোর কারণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও পরবর্তী হামলাগুলির বিষয়ে কী তথ্য থাকে, তা পরবর্তী শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

১৩ অক্টোবর মামলাটি ফের আদালতে উঠবে। তার আগে রাজ্যের রিপোর্টেই স্পষ্ট হতে পারে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তা কমানোর সিদ্ধান্ত কোন প্রক্রিয়ায় এবং কী কী তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন