বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্তে অনড় শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina)। ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার কথা ফের স্পষ্ট করে জানিয়ে তিনি বলেছেন, জনগণের কাছে তাঁর ফিরে যাওয়া প্রয়োজন। গ্রেফতার বা কারাবাসের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলেও তা মেনে নিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী।
একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নিজের মাতৃভূমিতে ফেরার বিষয়ে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে দেশে ফেরার অধিকার তাঁর রয়েছে এবং আইন মেনেই শান্তিপূর্ণভাবে দেশে ফিরতে চান তিনি।
দেশে ফেরার পদ্ধতি নিয়েই এখন মূল প্রশ্ন বলে জানিয়েছেন হাসিনা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি তিনি শুধু নিজের প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন না। বরং কীভাবে দেশে ফিরলে বাংলাদেশের জনগণ এবং দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে, সেটিই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
এর আগেও ডিসেম্বরের ফেরার কথা জানিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তিনি এবং আওয়ামি লিগের কয়েক জন শীর্ষ নেতা ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফিরে আদালতের সামনে হাজির হতে পারেন। গ্রেফতার, কারাবাস এমনকি প্রাণহানির আশঙ্কার কথাও তখন তিনি উল্লেখ করেছিলেন।
আগস্টেও দিল্লি থেকে দেওয়া এক অডিয়ো বার্তায় একই অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য ছিল, তাঁকে আটক করা হতে পারে বা জেলে পাঠানো হতে পারে, কিন্তু সেই আশঙ্কা দেশের মানুষের প্রতি তাঁর দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত বদলাবে না।
তবে দেশে ফিরলে শেখ হাসিনার সামনে আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (International Crimes Tribunal) তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ট্রাইব্যুনালের পূর্ণাঙ্গ রায়ে জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে তাঁর ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’-র কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
এই রায় অবশ্য মেনে নেননি শেখ হাসিনা। তাঁর দাবি, বিচারপ্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অন্যায্য। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো এবং তাঁর সরকারের পতনের পর তৈরি ব্যবস্থাকেও তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সমালোচনা করেছেন। এগুলি তাঁর নিজস্ব বক্তব্য, যার সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান কর্তৃপক্ষের অবস্থান এক নয়।
কারাবাসের সম্ভাবনা নিয়েও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন হাসিনা। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া এবং বাংলাদেশের মানুষের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে জেল যদি তাঁকে দিতে হয়, সেই মূল্য দিতেও তিনি প্রস্তুত। অর্থাৎ দেশে ফেরার পথে সম্ভাব্য আইনি পরিণতি তাঁর ঘোষিত সিদ্ধান্ত বদলানোর কারণ নয়।
মৃত্যুদণ্ডের প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা ওই বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি নিজের বিরুদ্ধে হওয়া মামলায় যথাযথ আইনি অধিকার এবং ন্যায়বিচারের সুযোগ চান। নিজের পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়ার উদাহরণ টেনে তিনি বলেছেন, তাঁর ক্ষেত্রেও আইনের সমান প্রয়োগ প্রত্যাশা করেন।
বাংলাদেশে তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আওয়ামি লিগের কার্যক্রম বর্তমানে নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে এবং হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে দলটির সমর্থকদের মধ্যে সক্রিয়তার খবর প্রকাশ্যে এসেছে। তবে তাঁর ফেরার নির্দিষ্ট দিন বা কী প্রক্রিয়ায় তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করবেন, সে বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত ঘোষণা সামনে আসেনি।
ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত বিষয়ও আলাদা আইনি ও কূটনৈতিক প্রশ্ন তৈরি করছে। বাংলাদেশ সরকার হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর নিজের সাক্ষাৎকারেও অবশ্য ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে তাঁর প্রত্যাবর্তন নিয়ে কোনও চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিক সমঝোতার কথা বিস্তারিতভাবে জানানো হয়নি।
ফলে আপাতত শেখ হাসিনার অবস্থান স্পষ্ট—ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা রয়েছে এবং সম্ভাব্য কারাবাসের আশঙ্কাতেও সেই সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছেন না। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তন বাস্তবে কীভাবে হবে, তাঁর বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার কী পরিণতি হবে এবং ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত অবস্থান কোন দিকে যায়, সেদিকেই এখন নজর।



