রাশিয়া-ইরানকেও বার্তা মোদির, BRICS মঞ্চে বললেন ‘নৌচলাচলের স্বাধীনতা জরুরি’

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান-আমেরিকা সংঘাতের মধ্যে BRICS সম্মেলনে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, অবাধ নৌচলাচল ও কূটনৈতিক আলোচনার পক্ষে জোরালো বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ইরান-আমেরিকা সংঘাত এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে ভারতে বসেছে ব্রিকস সম্মেলন (BRICS Summit)। সেই মঞ্চ থেকেই রাশিয়া ও ইরান—দুই দেশকেই কার্যত বার্তা দিল ভারত। শুক্রবার বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) স্পষ্ট জানালেন, বিশ্ব অর্থনীতির স্বার্থে সমুদ্রপথে অবাধ নৌচলাচল এবং নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে রাশিয়াকে আলোচনার পথ বেছে নেওয়ার বার্তাও দিয়েছেন তিনি।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব গত চার বছর ধরে শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তাতেও তার প্রভাব পড়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ব্রিকসের মঞ্চে মোদি বলেন, যুদ্ধের কারণে সমুদ্রপথে বাণিজ্য এবং নাবিকদের নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নৌচলাচলের স্বাধীনতা এবং নাবিকদের নিরাপত্তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনও সংঘাতের সমাধানে কূটনৈতিক আলোচনা এবং সংলাপকেই একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নেওয়া উচিত বলেও বার্তা দেন তিনি। ইউক্রেনের সঙ্গে যাবতীয় সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নেওয়ার জন্য রাশিয়ার উদ্দেশেও তাঁর এই বার্তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের পাশাপাশি মোদির বক্তব্যে উঠে আসে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রসঙ্গও। আমেরিকা-ইরান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যপথে অস্থিরতার প্রভাব পড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহণ—সব ক্ষেত্রেই তার ধাক্কা লাগতে পারে।

ভারতের ক্ষেত্রেও হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে এই সমুদ্রপথ সরাসরি যুক্ত। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগের আবহে ব্রিকসের মঞ্চ থেকে মোদির বক্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও সমুদ্রপথে ভারতীয় নাবিক ও জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানি নিয়েও ভারতের উপর মার্কিন চাপ এবং অতিরিক্ত শুল্কের বিষয়টি সামনে এসেছে। ফলে সংঘাতের প্রভাব কীভাবে বিশ্ব বাণিজ্য ও ভারতের অর্থনীতিতে পড়ছে, সেই বৃহত্তর ছবিটিই তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী।

মোদির বার্তা শুধু যুদ্ধ থামানোর আহ্বানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ব্রিকসের মঞ্চ থেকে তিনি ভারতের অর্থনৈতিক ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, বিশ্বজুড়ে নানা অস্থিরতার মধ্যেও ভারত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সেতু গড়ে তুলছে। প্রায় ৪০টি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি স্টার্টআপ এবং এমএসএমই ক্ষেত্রে বাজার, অর্থায়ন ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

ব্রিকসের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বোঝাতে প্রধানমন্ত্রী জানান, জোটভুক্ত দেশগুলির সম্মিলিত জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ। বৈশ্বিক জিডিপিতে তাদের অংশ প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বিশ্ব বাণিজ্যে অবদান ২৫ শতাংশেরও বেশি।

মোদির বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে ব্রিকস দেশগুলির অর্থনীতি বিশ্বের সামগ্রিক অর্থনীতির তুলনায় দ্রুত গতিতে বাড়ছে। যেখানে বিশ্বের জিডিপি বৃদ্ধির হার প্রায় ২.৫ শতাংশ, সেখানে ব্রিকস দেশগুলির সম্মিলিত জিডিপি বৃদ্ধির হার প্রায় ৪ শতাংশ। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্রিকস দেশগুলির অবদান ৩৮ শতাংশের কাছাকাছি, যেখানে জি৭ (G7) দেশগুলির অবদান প্রায় ২৭ শতাংশ।

যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা এবং সমুদ্রপথে অস্থিরতার আবহে ভারতের মাটিতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলন তাই কূটনৈতিক দিক থেকেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একই মঞ্চে রাশিয়া ও ইরানের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে মোদির এই বার্তা—সংঘাত নয়, নিরাপদ সমুদ্রপথ, অবাধ বাণিজ্য এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান—ভারতের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির অবস্থানই তুলে ধরল।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন