নেতাজির ফরওয়ার্ড ব্লকে আস্থা নেই? বিজেপি-তৃণমূল ঘুরে এবার ‘আজাদ হিন্দ পার্টি’ গড়ছেন চন্দ্র বসু

বিজেপি ও তৃণমূলের পর এবার নিজস্ব রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের ভাবনা চন্দ্র কুমার বসুর, নেতাজির আদর্শকে সামনে রেখে ‘আজাদ হিন্দ পার্টি’ গড়ার পরিকল্পনা, মূল শক্তি হিসেবে জেন জি।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নজরবন্দি ব্যুরো: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর (Subhas Chandra Bose) আদর্শকে সামনে রেখে এবার নতুন রাজনৈতিক দল তৈরির পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আনলেন তাঁর পরিবারের সদস্য চন্দ্র কুমার বসু (Chandra Kumar Bose)। প্রস্তাবিত দলের নাম ‘আজাদ হিন্দ পার্টি’। তাঁর দাবি, নতুন এই রাজনৈতিক উদ্যোগে সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকবে জেনারেশন জেড বা জেন জি-র। ১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে নেতাজির আজাদ হিন্দ সরকার ঘোষণার দিনটিকেই নতুন দলের রাজনৈতিক যাত্রার সূচনাদিবস হিসেবে বেছে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

চন্দ্র কুমার বসু নেতাজির প্রপৌত্র নন, তিনি নেতাজির প্রপৌত্রের আগের প্রজন্মের আত্মীয়—নেতাজির দাদা শরৎচন্দ্র বসুর নাতি এবং তাঁর grandnephew। রাজনীতিতে তাঁর এই নতুন উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর। তার আগে বিজেপি এবং ফরওয়ার্ড ব্লকের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।

চন্দ্র বসুর পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন দলের সূচনা হতে পারে নেতাজির জন্মস্থান কটক থেকে। ২১ অক্টোবরই দলের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। প্রথম কর্মসূচিও কটকেই হতে পারে। তাঁর সঙ্গে নেতাজির আদর্শে বিশ্বাসী এবং নেতাজিকে নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা একটি গোষ্ঠীও যুক্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তবে এই রাজনৈতিক উদ্যোগে প্রচলিত রাজনীতির চেনা মুখের বদলে তরুণ প্রজন্মকেই সামনে রাখতে চাইছেন চন্দ্র। তাঁর বক্তব্য, জেন জি-র মধ্যে এমন একটি পরিবর্তনের শক্তি রয়েছে, যা শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে পারে।

সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন চন্দ্র বসু। তার আগে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তিনি তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। তারও আগে বিজেপির সঙ্গে দীর্ঘ সময় যুক্ত ছিলেন। ২০১৬ সালে অমিত শাহের (Amit Shah) উপস্থিতিতে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ২০২৩ সালে বিজেপি ছাড়ার সময়ও নেতাজির আদর্শকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন চন্দ্র। পরে ২০২৬ সালে তৃণমূলে যোগ দেন।

এবার নিজের দল তৈরির সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে চন্দ্র বসু জানিয়েছেন, বিজেপিতে থাকাকালীনও নেতাজির আদর্শকে জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি বলে তাঁর দাবি। তৃণমূলের ক্ষেত্রেও একই কারণে ভবিষ্যতে জাতীয় স্তরে নেতাজির আদর্শ নিয়ে কাজ করার সুযোগ দেখছেন না তিনি।

তাঁর বক্তব্য, দল বদল করাই তাঁর উদ্দেশ্য নয়। বরং কোনও একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের ছাতার বাইরে থেকে নেতাজির রাজনৈতিক দর্শনকে সামনে রেখে কাজ করাই তাঁর লক্ষ্য। সেই কারণেই এবার নিজস্ব রাজনৈতিক দল তৈরির চিন্তা।

এই ভাবনা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। চন্দ্র বসুর দাবি, বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আগেই জাতীয় স্তরে ‘আজাদ হিন্দ মোর্চা’ ধরনের একটি রাজনৈতিক সংগঠন তৈরির পরিকল্পনা ছিল তাঁর। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) সঙ্গে তাঁর এ বিষয়ে কথাও হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।

চন্দ্রের বক্তব্য অনুযায়ী, তখন তাঁকে বলা হয়েছিল দেশে ইতিমধ্যেই বিপুল সংখ্যক রাজনৈতিক দল রয়েছে। নতুন করে আরও একটি দল তৈরি না করে কোনও প্রতিষ্ঠিত দলের ভিতর থেকেই কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই পথেই বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।

তবে নেতাজিকে নিয়ে কেন্দ্রের উদ্যোগগুলির ক্ষেত্রে মোদী সরকারের কিছু পদক্ষেপের প্রশংসাও করেছেন চন্দ্র। বিশেষ করে নেতাজি সংক্রান্ত একাধিক সরকারি নথি প্রকাশ্যে আনার উদ্যোগকে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে দেখছেন। তাঁর মতে, এর ফলে নেতাজিকে ঘিরে বহু পুরনো আলোচনা ও গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন তথ্য সামনে এসেছে।

কিন্তু তাঁর মতে, শুধু নেতাজির গোপন নথি প্রকাশ করা কিংবা তাঁর অন্তর্ধান ও মৃত্যুর রহস্য নিয়ে বিতর্ক চালিয়ে যাওয়াই যথেষ্ট নয়। নেতাজির রাজনৈতিক আদর্শকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করাই আসল কাজ। এখানেই বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে তাঁর মূল মতপার্থক্য বলে জানিয়েছেন তিনি।

জেন জি-কে সামনে রাখার যুক্তিও সেখানেই। চন্দ্র বসুর মতে, তরুণ প্রজন্ম কোনও প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাসী নয়। সাম্প্রতিক ছাত্র ও যুব আন্দোলনগুলির উদাহরণ টেনে তাঁর দাবি, পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করার ক্ষমতা এই প্রজন্মের রয়েছে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে—গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ওড়িশা এবং পশ্চিমবঙ্গ-সহ বিভিন্ন রাজ্যে নেতাজি-অনুরাগী তরুণ ও গবেষকদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছেন চন্দ্র। সেই যোগাযোগকেই নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের ভিত্তি হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছেন তিনি।

এখনও ‘আজাদ হিন্দ পার্টি’র সাংগঠনিক কাঠামো, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন, নির্বাচনী প্রতীক এবং নেতৃত্বের পূর্ণাঙ্গ তালিকা চূড়ান্ত হয়নি। ফলে এটি এখনই একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে—এমন দাবি করার জায়গা নেই। বরং চন্দ্র বসুর ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দিনে সেই প্রক্রিয়া শুরু হতে চলেছে।

নেতাজির প্রতিষ্ঠিত ফরওয়ার্ড ব্লক এখনও রাজনৈতিক পরিসরে সক্রিয় থাকলেও তার বর্তমান ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। অতীতেও চন্দ্র কুমার বসু ফরওয়ার্ড ব্লকের বর্তমান অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন এবং দাবি করেছিলেন, দলটি নেতাজির মূল রাজনৈতিক আদর্শ থেকে অনেকটাই সরে গিয়েছে।

তাই ‘আজাদ হিন্দ পার্টি’ তৈরির ভাবনা সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—নেতাজির নাম ও আদর্শকে কেন্দ্র করে কি এবার নতুন রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করতে চাইছেন তাঁর পরিবারেরই এক সদস্য? আপাতত উত্তর ভবিষ্যতের হাতে। তবে বিজেপি ও তৃণমূল—দুই দলের সঙ্গেই রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পর চন্দ্র বসুর নতুন উদ্যোগ জাতীয় রাজনীতিতে কতটা জায়গা তৈরি করতে পারে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন