গুরু হলেন জীবনের সেই পথপ্রদর্শক, যিনি অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোয় নিয়ে যান। সেই গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভক্তি নিবেদনের দিনই গুরু পূর্ণিমা (Guru Purnima 2026)। প্রতি বছর আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত এই উৎসব হিন্দু, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালেও দেশজুড়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হবে এই পবিত্র দিন।
অনেকেই ইতিমধ্যেই জানতে চাইছেন—গুরু পূর্ণিমা ২০২৬ কবে?, পূর্ণিমা তিথি কখন শুরু হবে?, গুরু পূজার শুভ মুহূর্ত কোন সময়? এই প্রতিবেদনে রইল গুরু পূর্ণিমা ২০২৬-এর সম্পূর্ণ সময়সূচি ও ধর্মীয় তাৎপর্য।
গুরু পূর্ণিমা ২০২৬ কবে?
২০২৬ সালে ২৯ জুলাই, বুধবার পালিত হবে গুরু পূর্ণিমা। হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিতেই এই উৎসব উদযাপন করা হয়। এই দিনটি ব্যাস পূর্ণিমা নামেও পরিচিত, কারণ প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী মহর্ষি বেদব্যাস (Ved Vyasa)-এর জন্মতিথি এই দিনেই।
গুরু পূর্ণিমা ২০২৬: তিথি ও শুভ মুহূর্ত
| অনুষ্ঠান | সময় |
|---|---|
| উৎসবের তারিখ | ২৯ জুলাই ২০২৬ (বুধবার) |
| পূর্ণিমা তিথি শুরু | ২৮ জুলাই ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:১৮ মিনিট |
| পূর্ণিমা তিথি শেষ | ২৯ জুলাই ২০২৬, রাত ৮:০৫ মিনিট |
| গুরু পূজার শুভ মুহূর্ত | সকাল ৫:৪১ মিনিট – সকাল ৯:০৫ মিনিট |
| রাহুকাল (এড়িয়ে চলুন) | দুপুর ১২:২৭ মিনিট – দুপুর ২:০৮ মিনিট |
বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী রাহুকালের সময় নতুন শুভ কাজ বা পূজা শুরু না করাই শ্রেয়। তাই গুরু পূজার জন্য সকালের শুভ মুহূর্তকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।
কেন পালিত হয় গুরু পূর্ণিমা?
ভারতীয় সংস্কৃতিতে গুরুর স্থান সর্বোচ্চ সম্মানের। ‘গু’ অর্থ অন্ধকার এবং ‘রু’ অর্থ সেই অন্ধকার দূরকারী। অর্থাৎ গুরু হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি জ্ঞান দিয়ে জীবনের অজ্ঞানতা দূর করেন।
এই দিনটি শুধু আধ্যাত্মিক গুরুর জন্য নয়; শিক্ষক, বাবা-মা, মেন্টর কিংবা জীবনের যে কোনও পথপ্রদর্শকের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানানোর দিন। বহু আশ্রম, মঠ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ পূজা, গুরু বন্দনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
কেন ব্যাস পূর্ণিমা বলা হয়?
গুরু পূর্ণিমাকে ব্যাস পূর্ণিমা বলা হয় কারণ এই দিনটি মহর্ষি বেদব্যাস (Ved Vyasa)-এর জন্মজয়ন্তী হিসেবে পালিত হয়। তিনি চারটি বেদের সংকলন, মহাভারত রচনা এবং আঠারোটি পুরাণ সংকলনের জন্য ভারতীয় ধর্ম ও দর্শনের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঋষি হিসেবে সম্মানিত।
তাঁকেই সনাতন ধর্মে ‘আদি গুরু’ হিসেবে শ্রদ্ধা জানানো হয়। তাই গুরু পূর্ণিমার দিন বেদব্যাসের স্মরণ ও গুরু বন্দনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
জ্যোতিষশাস্ত্রে গুরু পূর্ণিমার গুরুত্ব
বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রে বৃহস্পতি (Jupiter)-কে জ্ঞান, ধর্ম, শিক্ষা ও প্রজ্ঞার কারক গ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গুরু পূর্ণিমার দিনে গুরুর আশীর্বাদ গ্রহণ, ধর্মগ্রন্থ পাঠ, দান-পুণ্য এবং আত্মবিশ্লেষণকে অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে গুরুর আশীর্বাদ গ্রহণ করলে জীবনে ইতিবাচক শক্তি, জ্ঞান এবং মানসিক স্থিতি বৃদ্ধি পায়।
গুরু পূর্ণিমায় কীভাবে পূজা করবেন?
গুরু পূর্ণিমার দিন ভোরে স্নান সেরে পরিষ্কার বা হলুদ রঙের পোশাক পরা শুভ বলে মনে করা হয়। এরপর গুরুর ছবি বা প্রতিমার সামনে প্রদীপ, ধূপ, ফুল, ফল ও মিষ্টি নিবেদন করে প্রণাম করা যায়।
এই দিনে অনেকেই ‘গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু গুরুদেব মহেশ্বর’ মন্ত্র জপ করেন। পাশাপাশি গুরুকে প্রণাম, গুরুদক্ষিণা প্রদান, ধর্মগ্রন্থ পাঠ এবং দরিদ্রদের দান করারও প্রচলন রয়েছে।
গুরু পূর্ণিমায় কী করা শুভ বলে মনে করা হয়?
- গুরুর আশীর্বাদ নেওয়া
- শিক্ষক বা অভিভাবককে প্রণাম করা
- ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা
- গরিব ও অভাবী মানুষকে দান করা
- গাছ লাগানো বা সেবামূলক কাজে অংশ নেওয়া
- আত্মসমালোচনা ও ধ্যান করা
উপসংহার
গুরু পূর্ণিমা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি কৃতজ্ঞতা, শিক্ষা এবং আত্মিক উন্নয়নের প্রতীক। ২০২৬ সালে ২৯ জুলাই গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করার পাশাপাশি নিজের জীবনের পথপ্রদর্শকদের ধন্যবাদ জানানোরও এটাই সেরা সময়। পূজার আগে তিথি ও শুভ মুহূর্ত জেনে নিয়ে ধর্মীয় আচার পালন করলে উৎসবের তাৎপর্য আরও বৃদ্ধি পায়।



