দুর্গাপূজা: বাঙালির হৃদয়ে মিশে থাকা এক ঐতিহ্যবাহী উৎসব

দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় নয়, এটি বাঙালির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে গোটা ভারত ও বিশ্বে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

দুর্গাপূজা বাঙালির সবচেয়ে আবেগঘন ও বহুমাত্রিক উৎসব। প্রতি বছর আশ্বিন মাসে এই উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়, যা সাধারণত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যে পড়ে। বাংলা, আসাম ও পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এটি সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়। দুর্গাপূজা মূলত দেবী দুর্গার মহিষাসুরকে বধ করার বিজয়কে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়, যা একদিকে যেমন পৌরাণিক, তেমনই আধুনিক সাংস্কৃতিক অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ।

পৌরাণিক কাহিনীতে বলা হয়েছে, অসুররাজ মহিষাসুর একসময় স্বর্গ দখল করে নেন। তখন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব তাঁদের শক্তি একত্র করে দেবী দুর্গাকে সৃষ্টি করেন। দশটি হাত, হাতে দেবতাদের দেওয়া অস্ত্র, সিংহবাহিনী দেবী শেষ পর্যন্ত মহিষাসুরকে পরাজিত করেন দশম দিনে। এই বিজয়ই বিজয়াদশমীর মূল প্রতীক।

দুর্গাপূজা: বাঙালির হৃদয়ে মিশে থাকা এক ঐতিহ্যবাহী উৎসব
দুর্গাপূজা: বাঙালির হৃদয়ে মিশে থাকা এক ঐতিহ্যবাহী উৎসব

উৎসবের সূচনা হয় মহালয়ায়, যখন দেবীর আগমনের বার্তা বয়ে আনে চণ্ডীপাঠ। ষষ্ঠী থেকে মূল পূজা শুরু হয়, সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে চলে পূজার মূল আয়োজন। প্রতিমা সাজানো হয় বিশাল মণ্ডপে, যেগুলো এক একটি শিল্পকর্মে পরিণত হয়। পূজা শেষ হয় বিজয়াদশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে, যা দেবীর কৈলাসে প্রত্যাবর্তনের প্রতীক।

আধুনিক দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি সামাজিক মিলনমেলা ও সাংস্কৃতিক স্ফূরণের এক বড় মঞ্চ। ঢাকের বাদ্যি, ধুনুচি নাচ, সন্ধিপুজোর জৌলুস ও সিঁদুর খেলার রঙে রঙিন হয় শহর-বন্দর। মহিলারা শাড়ি-গয়নায় সেজে ওঠেন, পরিবারের সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া ও ঘোরা-ফেরা করেন।

দুর্গাপূজা: বাঙালির হৃদয়ে মিশে থাকা এক ঐতিহ্যবাহী উৎসব
বাঙালির হৃদয়ে মিশে থাকা এক ঐতিহ্যবাহী উৎসব

কলকাতা শহরে দুর্গাপূজা এক বিশেষ মাত্রা পায়। প্রতিযোগিতা চলে কোন প্যান্ডেল বেশি দর্শক টানবে। শিল্পী, কারিগর, আলোকসজ্জা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি হয় থিমভিত্তিক প্যান্ডেল। অনেক সময় সেখানে সমসাময়িক সামাজিক বার্তা তুলে ধরা হয়।

২০২১ সালে ইউনেস্কো কলকাতার দুর্গাপূজাকে “Intangible Cultural Heritage of Humanity” হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা একান্তভাবে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেছে। কলকাতায় প্রায় ৩,০০০ এর বেশি পূজা অনুষ্ঠিত হয়, যার মধ্যে অনেকগুলি রাজনৈতিক ও কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতা পায়।

দুর্গাপূজার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। প্যান্ডেল নির্মাণ, প্রতিমা তৈরি, পোশাক, গয়না, আলো, খাবার, বিজ্ঞাপন ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট — সব মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয়। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, দুর্গাপূজাকে ঘিরে শুধুমাত্র সৃজনশীল শিল্প থেকেই আসে ৩২ কোটি টাকারও বেশি মূল্যমান।

ঢাকের বাদ্যি, ধুনুচি নাচ, সন্ধিপুজোর জৌলুস ও সিঁদুর খেলার রঙে রঙিন হয় শহর-বন্দর।
ঢাকের বাদ্যি, ধুনুচি নাচ, সন্ধিপুজোর জৌলুস ও সিঁদুর খেলার রঙে রঙিন হয় শহর-বন্দর।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পূজায় পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। মাটির প্রতিমা তৈরি হচ্ছে প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করে। বিসর্জনের সময় নদীতে দূষণ কমাতে সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা হচ্ছে। কিছু পুজো কমিটি ব্যবহার করছে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ।

সামাজিক পরিমণ্ডলেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। যেমন সিঁদুর খেলায় এখন সকল মহিলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, বৈবাহিক অবস্থা বা লিঙ্গের ঊর্ধ্বে গিয়ে। পশু বলির প্রথা প্রায় বন্ধ হয়েছে অধিকাংশ জায়গায়।

ভারত ছাড়িয়ে বাংলাদেশেও দুর্গাপূজা অন্যতম প্রধান হিন্দু উৎসব। সেখানেও হাজার হাজার পূজা হয়, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে। এছাড়া ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যেও দুর্গাপূজা সামাজিক সংহতির অনন্য উদাহরণ।

দুর্গাপূজা ২০২৫ আবার সেই স্নিগ্ধ নস্টালজিয়া আর আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাঙালির মন ভরিয়ে তুলবে। এই উৎসব কেবল ধর্ম নয়, এটি এক বাঙালির চেতনার রূপ, যা প্রেম, সাহস ও সামাজিক বন্ধনের এক অবিচ্ছেদ্য উৎসব।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

Advertisementspot_img

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর