পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। সম্ভাব্য হিংসা রুখতে এবং ভোটারদের আস্থা নিশ্চিত করতে রাজ্যে মোট ২,৪৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই কয়েকশো কোম্পানি রাজ্যে পৌঁছে এলাকায় টহল শুরু করেছে। কমিশনের ধারণা, ভোটের দিন থেকে গণনা পর্যন্ত গোটা সময় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে এত বড় বাহিনী প্রয়োজন হতে পারে।
প্রায় পাঁচ দশক পরে পশ্চিমবঙ্গে আবার দুই দফায় বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। শেষবার ১৯৭৭ সালে রাজ্যে দুই দিনে ভোটগ্রহণ হয়েছিল—১১ ও ১৪ জুন। সেই নির্বাচনের পরই জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসে এবং শুরু হয় দীর্ঘ বাম শাসনের অধ্যায়।


এরপর বহু বছর ধরে রাজ্যে এক দফাতেই ভোট হয়েছে। ২০০১ সাল পর্যন্ত বিধানসভা নির্বাচন সাধারণত একদিনেই সম্পন্ন হতো। তবে ২০০৬ সালে প্রথমবার ভোট হয় পাঁচ দফায়। পরে ধাপে ধাপে দফার সংখ্যা বেড়ে ২০১১ সালে ছয়, ২০১৬ সালে সাত এবং ২০২১ সালে আট দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবার দীর্ঘ সময় পর সেই প্রবণতায় পরিবর্তন এনে দুই দফায় ভোট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
নজিরবিহীন নির্বাচন বাংলায়, রাজ্যে মোতায়েন হচ্ছে ২৪৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী!

দিল্লির ‘নির্বাচন সদন’-এ সাংবাদিক বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার জানান, দীর্ঘ আলোচনা ও পর্যালোচনার পর দফার সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যাতে নির্বাচন পরিচালনা আরও সহজ ও কার্যকর হয়। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া অসম, কেরল, তামিলনাড়ু এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতে ভোটগ্রহণ হবে একদিনেই।
নিরাপত্তা ব্যবস্থাও এবার আগের তুলনায় অনেক বেশি কড়া। ২০২১ সালের নির্বাচনে প্রায় ১,০০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। সেই নির্বাচনের সময় কোচবিহারের শীতলখুঁচিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে চারজনের মৃত্যুর ঘটনায় তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।


এবার সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই আগেভাগে বাহিনী নামানো শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই রাজ্যে ৪৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হয়েছে। তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে এলাকায় টহল বা ‘এরিয়া ডমিনেশন’, ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থা তৈরি করা, ভোটের দিন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইভিএম রাখা স্ট্রংরুম পাহারা দেওয়া।
মার্চের শুরুতেই প্রথম দফায় ১১০ কোম্পানি সিআরপিএফ এবং ৫৫ কোম্পানি বিএসএফ রাজ্যে পৌঁছায়। পাশাপাশি সিআইএসএফ, আইটিবিপি এবং এসএসবি-র জওয়ানদেরও মোতায়েন করা হয়েছে। পরে ১০ মার্চ আরও ১২০ কোম্পানি সিআরপিএফ এবং ৬৫ কোম্পানি বিএসএফ রাজ্যে এসেছে বলে জানা গেছে।
তবে বাহিনী নামানো শুরু হলেও ইতিমধ্যেই কিছু অশান্তির খবর সামনে এসেছে। দক্ষিণ ২৪ পরগণায় এক বিজেপি কর্মীকে গুলি করার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে উত্তর কলকাতার গিরিশ পার্ক এলাকায় রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজার বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে, যার জন্য বিজেপি সমর্থকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছে।


এর পাশাপাশি ভোটার তালিকা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ার পর প্রায় ৪৫ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং সম্পূরক তালিকা প্রকাশের অপেক্ষা চলছে। কমিশনের আশঙ্কা, বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়লে কিছু এলাকায় উত্তেজনা ছড়াতে পারে।
এই বিতর্কিত বা বিচারাধীন ভোটারদের বেশিরভাগই রয়েছে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে, যেমন উত্তর ২৪ পরগণা, দক্ষিণ ২৪ পরগণা, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুর ও দক্ষিণ দিনাজপুরে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ কলকাতায় বৈঠক করার সময় বিজেপি ও সিপিএম দাবি জানিয়েছিল, নির্বাচন যেন এক বা দুই দফার মধ্যেই শেষ করা হয়। শেষ পর্যন্ত কমিশন দুই দফার মডেলেই নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের ভোট ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।







