নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেষ্টা চলছে, ভারতবিরোধী প্রচারেই জটিলতা—স্বীকার ইউনূস প্রশাসনের

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে সাম্প্রতিক টানাপড়েন কাটাতে উদ্যোগী ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকার। ইউনূস প্রশাসনের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের মতে, দেশের ভিতরের ভারতবিরোধী প্রচারই সম্পর্কের পথে বড় বাধা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক শৈত্য কাটাতে সক্রিয় চেষ্টা চালাচ্ছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার—এমনটাই স্বীকার করলেন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। তাঁর মতে, নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক আর অবনতির দিকে যাবে না, বরং তা স্বাভাবিক করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সালেহউদ্দিন স্পষ্ট করে জানান, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নিজেও অবগত এবং বিষয়টি তাঁর নজরেই রয়েছে। তবে সম্পর্ক জটিল হয়ে ওঠার নেপথ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চলতে থাকা ভারতবিরোধী প্রচারকেই অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।

রাজনৈতিক উত্তেজনার ছায়া বাণিজ্যেও

শেখ হাসিনার দেশত্যাগ ও ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যে রাজনৈতিক টানাপড়েন শুরু হয়। তার প্রভাব পড়ে দু’দেশের কূটনৈতিক বার্তা বিনিময় ও প্রশাসনিক যোগাযোগেও। আমদানি-রফতানি ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও আরোপ করা হয়।

তবে অর্থ উপদেষ্টার দাবি, এই রাজনৈতিক টানাপড়েন সত্ত্বেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখনও কার্যত স্বাভাবিক। তাঁর কথায়, “রাজনৈতিক সম্পর্ক আর অর্থনৈতিক সম্পর্ক আলাদা করে দেখা উচিত। সরকার রাজনৈতিক স্তরে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।”

৫০ হাজার টন চাল আমদানির সিদ্ধান্তে তাৎপর্য

চলমান উত্তাপের মাঝেই ভারত থেকে ৫০ হাজার টন সেদ্ধ চাল আমদানির প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে—এই তথ্যকে সম্পর্ক উন্নতির বাস্তব উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন সালেহউদ্দিন।

তিনি বলেন,
“ভারত ছেড়ে যদি ভিয়েতনাম বা অন্য কোনও দেশ থেকে চাল আনতে যাই, কেজি প্রতি অন্তত ১০ টাকা বেশি খরচ হবে। ঠিক দামে চাল পাওয়া গেলে প্রতিবেশী দেশকে বাদ দিয়ে অন্যত্র যাওয়ার কোনও যুক্তি নেই।”

ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির প্রসঙ্গ টেনে আক্ষেপও শোনা যায় তাঁর গলায়। তাঁর মতে, আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম আরও দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসত।

‘ভারত আমাদের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না’

সালেহউদ্দিন আহমেদের দাবি, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত হস্তক্ষেপ করে না। তিনি বলেন,
“ওরা (ভারত) হয়তো কিছু বক্তব্য দেয়, আমরাও দিই—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সরাসরি হস্তক্ষেপ করে না।”

একইসঙ্গে আঞ্চলিক কূটনীতির উপর জোর দিয়ে তিনি জানান, ইউনূস সরকার শুধু ভারতের সঙ্গে নয়, নেপাল, ভুটান এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গেও ধীরে ধীরে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে হাঁটছে। তাঁর কথায়,
“বাংলাদেশ একা থেকে চলতে পারে না। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখাই বাস্তবতা।”

ভারতবিরোধী প্রচারে অস্বস্তি ঢাকার

সম্প্রতি নির্বাচন ঘোষণার পর বাংলাদেশে শুরু হওয়া বিক্ষিপ্ত হিংসা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম মুখ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর কিছু রাজনৈতিক বক্তব্যে ভারতবিরোধী সুর তীব্র হয়েছে—যা নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন করে চাপে ফেলেছে।

এই বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন সালেহউদ্দিন। তাঁর মন্তব্য,
“এই ধরনের ভারতবিরোধী প্রচার যারা চালাচ্ছে, তারা আমাদের অবস্থানকে আরও কঠিন করে তুলছে। এটা বাংলাদেশের জাতীয় মনোভাব নয়। আমরা কোনও দেশ, বিশেষ করে প্রতিবেশীর সঙ্গে খারাপ সম্পর্ক চাই না।”

ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকার বুঝতে পারছে—ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা কৌশলগত ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই জরুরি। ইউনূস প্রশাসনের শীর্ষ স্তর থেকে ভারতবিরোধী প্রচারের সমালোচনা এবং বাস্তব বাণিজ্যিক সহযোগিতার বার্তা এই ইঙ্গিতই দিচ্ছে যে, সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টায় ঢাকাও এখন বাস্তবতার পথে হাঁটতে চাইছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন