কেন শুধু নিমকাঠেই তৈরি হয় জগন্নাথদেবের মূর্তি? নবকলেবর থেকে জীবনদর্শনের গভীর রহস্য

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে কেন পাথরের বদলে নিমকাঠের বিগ্রহ পূজিত হয়? দারু ব্রহ্ম, নবকলেবর, পুরাণ এবং জীবনদর্শনের গভীর তাৎপর্য জানুন।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

পুরীর জগন্নাথ মন্দির শুধু একটি তীর্থস্থান নয়, এটি ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা, বিশ্বাস এবং জীবনদর্শনের এক অনন্য প্রতীক। এই মন্দিরের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যগুলির একটি হল— এখানে জগন্নাথদেব, বলভদ্র, সুভদ্রা ও সুদর্শনের বিগ্রহ পাথর বা ধাতুর নয়, বরং বিশেষভাবে নির্বাচিত নিমকাঠ দিয়ে নির্মিত। কেন এই ব্যতিক্রমী প্রথা? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে পুরাণ, ধর্মীয় বিশ্বাস, নবকলেবর আচার এবং মানবজীবনের গভীর দর্শনের মধ্যে।

নিমকাঠ কেন এত পবিত্র?

জগন্নাথ সংস্কৃতিতে নিমকাঠকে বলা হয় ‘দারু ব্রহ্ম’। ‘দারু’ অর্থ কাঠ এবং ‘ব্রহ্ম’ অর্থ পরম চৈতন্য। বিশ্বাস করা হয়, ভগবান স্বয়ং এই পবিত্র কাঠে অধিষ্ঠান করেন। তাই সাধারণ কাঠ নয়, কঠোর ধর্মীয় বিধি মেনে নির্বাচিত বিশেষ নিমগাছ থেকেই জগন্নাথদেবের বিগ্রহ নির্মাণ করা হয়।

ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি নিমগাছের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও গুরুত্বপূর্ণ। নিম দীর্ঘস্থায়ী, প্রাকৃতিকভাবে পোকামাকড় প্রতিরোধী এবং ভারতীয় সংস্কৃতিতে পবিত্র ও শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

যে কোনও নিমগাছ নয়, কীভাবে নির্বাচন করা হয় ‘দারু’?

জগন্নাথদেবের বিগ্রহ তৈরির জন্য ব্যবহৃত নিমগাছ নির্বাচন একটি অত্যন্ত গোপন এবং ধর্মীয় আচারসমৃদ্ধ প্রক্রিয়া। নবকলেবর উৎসবের সময় মন্দিরের দৈতাপতি সেবক ও পুরোহিতরা বিশেষ পূজা-অর্চনার মাধ্যমে সেই গাছের সন্ধানে বের হন।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, নির্বাচিত গাছে শঙ্খ, চক্র, গদা বা পদ্মের মতো শুভ চিহ্ন থাকতে হয়। পাশাপাশি গাছটির অবস্থান, আশপাশের পরিবেশ, নিকটবর্তী নদী, শ্মশান কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় লক্ষণও বিচার করা হয়। এই সমগ্র প্রক্রিয়াকে ভক্তরা ঈশ্বরের নির্দেশ অনুসরণ বলেই মনে করেন।

নবকলেবর: মৃত্যু নয়, নতুন জীবনের বার্তা

জগন্নাথদেবের বিগ্রহ চিরস্থায়ী নয়। সাধারণত ১২ থেকে ১৯ বছর অন্তর নবকলেবর উৎসব পালিত হয়। এই সময় পুরনো কাঠের বিগ্রহের পরিবর্তে নতুন নিমকাঠের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

সবচেয়ে রহস্যময় অংশ হল ‘ব্রহ্ম পদার্থ’-এর স্থানান্তর। গভীর রাতে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে পুরনো বিগ্রহের অন্তর্নিহিত পবিত্র ব্রহ্ম নতুন বিগ্রহে স্থানান্তর করা হয়। এই আচারকে জন্ম, মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের চিরন্তন দর্শনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ শরীর বদলায়, কিন্তু আত্মা চিরন্তন— এই দর্শনই নবকলেবরের মূল বার্তা।

জগন্নাথ মূর্তির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক অলৌকিক কাহিনি

পুরাণ ও লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বপ্নে ভগবান বিষ্ণু-র নির্দেশ পান যে, তিনি নীলাচলে বিশেষ রূপে পূজিত হতে চান। সেই নির্দেশ মেনে তিনি পুরীতে মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেন।

একদিন সমুদ্রতটে একটি অলৌকিক নিমকাঠ ভেসে আসে। বিশ্বাস করা হয়, সেটিই ছিল ‘দারু ব্রহ্ম’। সেই কাঠ দিয়েই দেবমূর্তি তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কেন অসম্পূর্ণ জগন্নাথের বিগ্রহ?

লোককথা অনুযায়ী, বিশ্বকর্মা বৃদ্ধ ছুতোরের ছদ্মবেশে এসে ২১ দিনের মধ্যে মূর্তি গড়ার শর্ত দেন। তবে সেই সময় কেউ দরজা খুলতে পারবেন না।

কয়েকদিন কোনও শব্দ না শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন দরজা খুলে ফেলেন। তখনই বিশ্বকর্মা অন্তর্ধান করেন। দেখা যায়, জগন্নাথদেব, বলভদ্রসুভদ্রা-র বিগ্রহ সম্পূর্ণ হলেও হাত-পা পূর্ণাঙ্গ নয়।

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দৈববাণী হয় যে ভগবান এই অসম্পূর্ণ রূপেই পূজিত হতে চান। সেই থেকে আজও একই রূপে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত ও পূজিত হয়ে আসছে।

জীবনদর্শনের সঙ্গে কীভাবে মিলে যায় এই প্রথা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, জগন্নাথদেবের নিমকাঠের বিগ্রহ শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় রীতি নয়, বরং গভীর দর্শনের প্রতীক।

কাঠ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, আবার নতুন কাঠে নতুন রূপে ঈশ্বরের আরাধনা শুরু হয়। এটি মনে করিয়ে দেয়— মানুষের শরীর নশ্বর হলেও আত্মা অমর। একইভাবে অসম্পূর্ণ বিগ্রহ যেন শেখায়, পূর্ণতা নয়, অসম্পূর্ণতার মধ্যেই জীবনের সৌন্দর্য ও ঈশ্বরের উপস্থিতি লুকিয়ে থাকে।

এই কারণেই পুরীর জগন্নাথধামের কাঠের বিগ্রহ শুধু একটি ধর্মীয় ঐতিহ্য নয়, বরং জন্ম, মৃত্যু, পুনর্জন্ম, বিনয় এবং মানবজীবনের চিরন্তন সত্যের এক অনন্য প্রতীক।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন