পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) ঘিরে বড় সিদ্ধান্ত নিল জাতীয় নির্বাচন কমিশন। বহু ভোটারের কাছে পরিচয় ও বয়সের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডকে আর বৈধ নথি হিসেবে গ্রহণ করা হবে না—কমিশনের এই নির্দেশ ঘিরে নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে রাজ্যজুড়ে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (CEO) মনোজকুমার আগরওয়াল এই নথিকে অনুমোদনের জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন, কিন্তু কমিশন সেই প্রস্তাব স্পষ্ট ভাবে খারিজ করে দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যাচ্ছে, SIR প্রক্রিয়ার জন্য আগেই মোট ১৩টি বৈধ নথির তালিকা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের সঙ্গে বিভিন্ন জেলার নির্বাচনী আধিকারিকদের বৈঠকে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডকে তালিকাভুক্ত নথির মধ্যে যুক্ত করার বিষয়টি আলোচনা হয়। এরপর CEO দফতর থেকে কমিশনের সদর দফতরে প্রস্তাব পাঠানো হলেও কমিশন তা গ্রহণ করেনি।
SIR-এর বৈধ নথি হিসেবে কমিশনের নির্ধারিত ১৩টি ডকুমেন্ট
কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, SIR সংক্রান্ত যাচাইয়ে বৈধ নথি হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে—
-
কেন্দ্র/রাজ্য সরকারের দেওয়া পরিচয়পত্র, পেনশন পেমেন্ট অর্ডার
-
১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের আগের নথি
-
জন্মের শংসাপত্র
-
পাসপোর্ট
-
শিক্ষাগত শংসাপত্র
-
ডোমিসাইল শংসাপত্র
-
বনাধিকার শংসাপত্র
-
জাতিগত শংসাপত্র
-
জাতীয় নাগরিক পঞ্জিতে (NRC) নাম
-
বংশলতিকার শংসাপত্র
-
সরকারের দেওয়া জমির নথি
-
আধার কার্ড
-
বিহারের SIR নথি
এদিকে কমিশন জানিয়েছে, নো-ম্যাপিং ও এনুমারেশন ফর্মে তথ্যগত অসঙ্গতি ধরা পড়লে খসড়া ভোটার তালিকায় নাম থাকা অনেক ভোটারকেই শুনানিতে ডাকা হচ্ছে। সেই শুনানিতে ভোটারকে কমিশন নির্ধারিত তালিকা থেকে যে কোনও একটি বৈধ নথি দেখাতে হবে। তারপর কমিশনের তরফে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
SIR অভিযোগ-নিষ্পত্তির সময়সীমা বাড়ল আরও ৪ দিন
শুধু নথি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তই নয়, পশ্চিমবঙ্গে SIR প্রক্রিয়া নিয়ে দাবি ও আপত্তি জানানোর সময়সীমাও বাড়িয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের বিবৃতি অনুযায়ী, সময়সীমা আরও ৪ দিন বাড়িয়ে ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১ জানুয়ারি ২০২৬-কে যোগ্যতার তারিখ ধরে এই সংশোধন প্রক্রিয়া চলছে। সেই অনুযায়ী, ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন, সংশোধন অথবা বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত সময় পাবেন।
এই নির্দেশিকা শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ নয়—একই সঙ্গে গোয়া, লাক্ষাদ্বীপ, রাজস্থান এবং পুদুচেরি রাজ্য/কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
কমিশনের চিঠিতে কী বলা হয়েছে?
কমিশনের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির কাছ থেকে পাওয়া অনুরোধ এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার করেই সময়সীমা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—
-
সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি অবিলম্বে রাজ্য গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশ করতে হবে
-
সেই বিজ্ঞপ্তির ৩টি কপি নির্বাচন কমিশনে পাঠাতে হবে
-
সময়সীমা বৃদ্ধির বিষয়টি জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে
আধিকারিকদের জন্য কড়া বার্তা
কমিশনের নির্দেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সব আধিকারিককে সংশোধিত সময়সূচি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। SIR প্রক্রিয়া যাতে নির্ধারিত নিয়মেই সম্পন্ন হয়, সেই দায়িত্ব থাকবে রাজ্য নির্বাচন দফতরের উপর।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত?
পশ্চিমবঙ্গে SIR ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। একাধিক পক্ষের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে কমিশনের সময়সীমা বৃদ্ধি এবং নথি সংক্রান্ত কড়াকড়ি প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ। কারণ, এতে একদিকে যেমন যাচাই প্রক্রিয়াকে আরও নিয়ন্ত্রিত করা হল, তেমনই অন্যদিকে সাধারণ মানুষের হাতে অতিরিক্ত সময় তুলে দেওয়া হল দাবি-আপত্তি জানাবার জন্য।
এখন দেখার, এই বাড়তি সময়ের মধ্যে ভোটার তালিকার সংশোধন প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, দ্রুত এবং নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করা যায়।






