রাজ্যে যারা দিনভর অন্যের জমিতে কাজ করেন, কিন্তু নিজেদের নামে এক চিলতে জমিও নেই—তাদের জন্য বড় সুখবর দিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। দীর্ঘদিন ধরে ‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্পের মাধ্যমে জমির মালিক কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলেও এবার সেই সুরক্ষা ছাতার তলায় আনা হচ্ছে ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদেরও। বছরে মোট ৪,০০০ টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর ঘোষণা ইতিমধ্যেই গ্রামীণ মহলে আলোড়ন তুলেছে।
সরকারি সূত্রের দাবি, কৃষিকাজে জড়িত অথচ জমির মালিকানা না থাকায় এতদিন বহু শ্রমজীবী মানুষ কোনও ভাতা পেতেন না। সেই বঞ্চনার অবসান ঘটাতেই এই বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্রকল্প। লক্ষ্য—গ্রামের সবচেয়ে প্রান্তিক ও আর্থিকভাবে দুর্বল শ্রেণিকে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।


কী মিলবে এই প্রকল্পে?
এই প্রকল্পের আওতায় যোগ্য ভূমিহীন ক্ষেতমজুররা বছরে মোট ৪,০০০ টাকা আর্থিক অনুদান পাবেন। তবে একসাথে পুরো টাকা নয়—
-
বছরে দুই কিস্তিতে ২,০০০ টাকা করে দেওয়া হবে
-
টাকা সরাসরি ডিবিটি (DBT) ব্যবস্থায় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে
এই পদ্ধতিতে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা থাকবে না বলেই দাবি প্রশাসনের।
কারা আবেদন করতে পারবেন?
সবাই এই সুবিধা পাবেন না। নির্দিষ্ট কিছু যোগ্যতার শর্ত রয়েছে—
-
আবেদনকারীকে অবশ্যই ভূমিহীন ক্ষেতমজুর হতে হবে
-
নিজের নামে কোনও চাষযোগ্য কৃষিজমি থাকা চলবে না
-
তিনি বর্গাদার বা ভাগচাষী হতে পারবেন না
-
পূর্বে ‘কৃষক বন্ধু’ প্রকল্পের সুবিধা পেয়ে থাকলে এই প্রকল্পে আবেদন করা যাবে না
বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে—আবেদনপত্রে স্পষ্ট উল্লেখ করতে হবে যে আবেদনকারী বর্গাদার নন।
আবেদন ফর্ম কীভাবে পূরণ করবেন?
প্রকল্পের ফর্মটি সাধারণত দুয়ারে সরকার ক্যাম্প বা সংশ্লিষ্ট বিডিও (BDO) অফিস থেকে নির্দিষ্ট রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও স্ট্যাম্পসহ দেওয়া হয়। বাইরে থেকে কিনে আনা ফর্ম গ্রহণযোগ্য নয়।
ফর্মটি মোট তিনটি পাতায় বিভক্ত:
প্রথম পাতা: ব্যক্তিগত ও ব্যাঙ্ক তথ্য
এই অংশটি ইংরেজিতে বড় হাতের অক্ষরে (Capital Letters) পূরণ করাই শ্রেয়।
এখানে যা যা লিখতে হবে—
-
নাম, পূর্ণ ঠিকানা (গ্রাম, পঞ্চায়েত, ব্লক, জেলা, পিন কোড)
-
বাবার বা স্বামীর নাম
-
জন্মতারিখ ও ০১/০১/২০২৬ অনুযায়ী বয়স
-
লিঙ্গ ও জাতি (SC/ST/OBC/General)
-
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর, IFSC কোড, ব্যাঙ্কের নাম
-
নমিনির নাম, সম্পর্ক ও বয়স
নমিনি যদি নাবালক হন, তবে তার অভিভাবকের নাম উল্লেখ করতে হবে। সবশেষে আবেদনকারীকে সই বা টিপসই দিয়ে রিসিট কপি বুঝে নিতে হবে।
দ্বিতীয় পাতা: স্বঘোষণা (Self Declaration)
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে আবেদনকারীকে ঘোষণা করতে হবে—
-
তার নামে কোনও চাষযোগ্য জমি নেই
-
তিনি বর্গাদার নন
-
অন্য কোনো সরকারি ভাতা পাচ্ছেন কিনা
ভুল তথ্য দিলে ভবিষ্যতে অনুদান ফেরত দিতে হবে—এই শর্তে সম্মতি জানিয়ে সই করতে হবে।
তৃতীয় পাতা: আধার সম্মতিপত্র
ডিবিটি ব্যবস্থায় টাকা পেতে হলে আধার লিংক বাধ্যতামূলক। এই পাতায় দিতে হবে—
-
আধার নম্বর
-
ভোটার কার্ড নম্বর
-
মোবাইল নম্বর
এবং সেখানে সম্মতিসূচক স্বাক্ষর করতে হবে।
কী কী নথি লাগবে?
আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হবে স্ব-স্বাক্ষরিত (Self-attested) জেরক্স—
-
আধার কার্ড
-
ভোটার কার্ড
-
ব্যাঙ্ক পাসবুকের প্রথম পাতা
যদি পাসবুকে ছবি না থাকে, তাহলে জেরক্স কপির উপর নিজের পাসপোর্ট সাইজ ছবি বসিয়ে দিতে হবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ?
গ্রামের অর্থনীতিতে ক্ষেতমজুরদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে ছিলেন অনেকেই। এই প্রকল্প তাঁদের জন্য একরকম ন্যূনতম আর্থিক সুরক্ষা। বিশেষত কৃষিনির্ভর পরিবারের জন্য বছরে অতিরিক্ত ৪,০০০ টাকা অনেক সময় বড় সহায়তা হয়ে উঠতে পারে।
প্রশাসনের বার্তা স্পষ্ট—যারা সত্যিই প্রান্তিক ও ভূমিহীন, তারাই যেন এই সুবিধা পান। তাই আবেদনপত্র পূরণের সময় সঠিক তথ্য দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।









