UPI লেনদেনে নতুন মাশুলের সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত তীব্র হল। ১৫ অক্টোবর থেকে ২,০০০ টাকার বেশি নির্দিষ্ট Person-to-Merchant (P2M) লেনদেনে ০.৪ শতাংশ Merchant Discount Rate বা MDR চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (NPCI)। এই সিদ্ধান্তকে আমেরিকার চাপের ফল বলে অভিযোগ করেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi)। তাঁর দাবি, এই নীতির মাধ্যমে ভারতীয় ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার উপর চাপ তৈরি হচ্ছে। কেন্দ্র অবশ্য জানিয়েছে, UPI-র এই নতুন কাঠামোতে সাধারণ গ্রাহককে কোনও MDR দিতে হবে না।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ২,০০০ টাকার বেশি নির্দিষ্ট মার্চেন্ট UPI লেনদেনে ০.৪ শতাংশ MDR ধার্য হবে। তবে ৭৫,০০০ টাকা বা তার বেশি লেনদেনের ক্ষেত্রে এই মাশুলের সর্বোচ্চ সীমা ৩০০ টাকা। অর্থাৎ লেনদেনের পরিমাণ আরও বাড়লেও নির্ধারিত ক্ষেত্রে MDR ৩০০ টাকার বেশি হবে না। এই খরচ মূলত মার্চেন্ট পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের উপর পড়বে, সরাসরি টাকা পাঠানো গ্রাহকের উপর নয়।
কেন্দ্রের তরফে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির অর্থ পাঠানো অর্থাৎ P2P UPI লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনও মাশুল থাকছে না। ২,০০০ টাকা পর্যন্ত মার্চেন্ট পেমেন্টও এই MDR-এর বাইরে রাখা হয়েছে। ছোট ব্যবসায়ীদের জন্যও নির্দিষ্ট ছাড় রয়েছে। সরকারি হিসাবে, মোট P2M লেনদেনের প্রায় ৯৬ শতাংশ এই নতুন কাঠামোয় প্রভাবিত হবে না।
তবে সিদ্ধান্তটি সামনে আসার পরই রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বুধবারের ভিডিয়োবার্তায় রাহুল গান্ধী কেন্দ্রের নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করছেন এবং UPI-তে মাশুল বসিয়ে সেই চাপেরই প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে।
নিজের বক্তব্যে রাহুল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর একটি পুরনো মন্তব্যের প্রসঙ্গও টানেন। তাঁর দাবি, ইন্দিরা গান্ধী নিজেকে কোনও রাজনৈতিক দিকে ঝুঁকে না থেকে ‘সোজা দাঁড়িয়ে থাকা’ নেত্রী হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। সেই প্রসঙ্গ টেনেই মোদী সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর রাজনৈতিক আক্রমণ।
রাহুলের অভিযোগের সঙ্গে কেন্দ্রের ব্যাখ্যার অবশ্য উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। অর্থ মন্ত্রক জানিয়েছে, MDR কোনও সরকারি কর নয় এবং এই অর্থ সরকার বা NPCI সরাসরি সংগ্রহ করবে না। নির্দিষ্ট মার্চেন্ট লেনদেন থেকে সংগৃহীত অর্থ ব্যাঙ্ক, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার এবং UPI অ্যাপ্লিকেশন প্রদানকারী-সহ পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের বিভিন্ন অংশীদারের মধ্যে বণ্টিত হবে।
সরকারের যুক্তি, UPI ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে টেকসই করতে নতুন কাঠামো প্রয়োজন। পেমেন্ট পরিকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা, উদ্ভাবন এবং গ্রাহক পরিষেবার মতো ক্ষেত্রে বিনিয়োগের জন্য এই ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে বলে সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষ যাতে অতিরিক্ত খরচের মুখে না পড়েন, সেই কারণে P2P লেনদেন এবং ছোট অঙ্কের মার্চেন্ট পেমেন্টকে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পরিষেবার ক্ষেত্রেও আলাদা কাঠামো রাখা হয়েছে। রেল, টেলিকম, বিমা, জ্বালানি এবং কৃষি-ইনপুটের মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ২,০০০ টাকার বেশি লেনদেনে ০.৪ শতাংশের বদলে ৫ টাকা ফ্ল্যাট MDR নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে মিউচুয়াল ফান্ড, সিকিউরিটিজ, স্টকব্রোকার ও ডিলারদের মতো ক্যাপিটাল মার্কেট লেনদেনে ০.০২ শতাংশ MDR এবং সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা সীমা রাখা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য, মার্চেন্টদের উপর ধার্য এই খরচ কোনওভাবেই গ্রাহকের উপর চাপানো যাবে না। অর্থ মন্ত্রক ব্যাঙ্কগুলিকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছে। ফলে ১৫ অক্টোবরের পর কোনও দোকানে ২,০০০ টাকার বেশি UPI পেমেন্ট করলেই গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে আলাদা করে MDR কেটে নেওয়ার কথা নয়।
এদিকে এই নীতিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি আইনি চ্যালেঞ্জের কথাও সামনে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি বা সুপ্রিম কোর্টের আনুষ্ঠানিক তালিকাভুক্তির বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক সূত্রে পর্যাপ্ত তথ্য মেলেনি। ফলে সেই অংশটি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে না দেখে পরবর্তী আদালতীয় নথির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করাই নিরাপদ।
সরকারের অবস্থানও আপাতত স্পষ্ট—UPI-র এই নতুন MDR কাঠামো পিছিয়ে নেওয়ার কোনও ইঙ্গিত নেই। অন্যদিকে বিরোধীদের প্রশ্ন, এতদিন বিনামূল্যে চলা UPI ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট মার্চেন্ট লেনদেনে মাশুল বসানোর প্রয়োজন কেন হল এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে। ফলে ১৫ অক্টোবর নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগেই UPI-কে ঘিরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।



