রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহ নিয়ে সমঝোতার পরেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির (Volodymyr Zelenskyy) নেতৃত্ব নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। শনিবার, ১০ অক্টোবর, ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনের এমন এক নতুন নেতা প্রয়োজন, যিনি রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার জন্য চুক্তি করতে পারবেন। তাঁর এই মন্তব্যের নেপথ্যে রয়েছে মস্কোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক ডিজেল চুক্তি এবং রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা নিয়ে দুই দেশের মতবিরোধ।
ট্রাম্পের বক্তব্য, জেলেনস্কির হাতে যুদ্ধ থামানোর একাধিক সুযোগ এসেছিল, কিন্তু তিনি সেই সুযোগ কাজে লাগাননি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, ইউক্রেনের পাল্টা হামলার কারণে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে। বিশেষ করে আমেরিকায় ডিজেলের দাম এবং কৃষিক্ষেত্রে জ্বালানির খরচ নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন তিনি। তবে এগুলি ট্রাম্পের নিজস্ব দাবি; জ্বালানির দামের জন্য ইউক্রেনের হামলাকেই একমাত্র কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো তথ্য নেই।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের ঠিক আগের দিন, শুক্রবার, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের (Vladimir Putin) সঙ্গে ডিজেল সরবরাহ নিয়ে সমঝোতার কথা ঘোষণা করেন তিনি। ওই চুক্তির আওতায় রাশিয়ার ডিজেল রফতানির উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে সরবরাহের পথ খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (Associated Press) প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুক্তিতে ৩ লক্ষ টনেরও বেশি ডিজেল সরবরাহের পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে রাশিয়ার উপর চাপ বজায় রাখার নীতির সঙ্গে এই পদক্ষেপের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলিতে ইউক্রেনের হামলা বন্ধ করার দাবিও ফের তুলেছেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য, এই ধরনের হামলা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের উপর প্রভাব ফেলছে। সেই কারণেই জেলেনস্কির বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন তিনি। তবে ইউক্রেনের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। কিয়েভের যুক্তি, রাশিয়ার জ্বালানি পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে যুদ্ধের সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করার উদ্দেশ্যে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের জবাবে ইউক্রেনের বিদেশমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা (Andrii Sybiha) জানিয়েছেন, জেলেনস্কির উপর ইউক্রেনের মানুষের সমর্থন রয়েছে এবং দেশের নেতৃত্ব কে দেবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ইউক্রেনীয়দেরই। বিদেশ থেকে আসা মন্তব্যের ভিত্তিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে পারে না—এমনই বার্তা দিয়েছেন তিনি। ফলে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে মতপার্থক্য এখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক সংঘাতের রূপ নিচ্ছে।
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে একাধিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে সওয়াল করছে। কিন্তু যুদ্ধ বন্ধের শর্ত, রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেনের নিরাপত্তা—এই বিষয়গুলিতে দুই পক্ষের অবস্থান এখনও পুরোপুরি মেলেনি। তার মধ্যেই পুতিনের সঙ্গে ডিজেল চুক্তি এবং জেলেনস্কিকে নেতৃত্ব থেকে সরানোর ইঙ্গিত আমেরিকা-ইউক্রেন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে অবশ্য ইউক্রেনে অবিলম্বে নির্বাচন হবে, এমন কোনও ঘোষণা নেই। তিনি মূলত জেলেনস্কির নেতৃত্বের সমালোচনা করে নতুন প্রেসিডেন্টের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এই মন্তব্যের পরেও যুদ্ধ শেষ করার কোনও চুক্তি হয়েছে বলে নিশ্চিত তথ্য নেই। বরং রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি সমঝোতা এবং ইউক্রেনের উপর মার্কিন চাপ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় থাকে, তার উপরই আগামী দিনের কূটনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটা নির্ভর করবে।



