কলকাতায় পাকিস্তানি নাগরিক রানা রউফ ওরফে ওয়াহাব আলমকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ গ্রেপ্তার। সোমবার তপসিয়া থেকে ইমরান হোসেন নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (STF)। তদন্তকারীদের অভিযোগ, রানাকে ভুয়ো ভারতীয় নথি তৈরি করে দিতে এবং ভারতে নিজের পরিচয় পাকাপোক্ত করতে সাহায্য করেছিলেন ইমরান। রানার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের সূত্র ধরেই তপসিয়ার ফ্ল্যাট থেকে তাঁকে পাকড়াও করা হয়েছে।
গত ১২ অগস্ট উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়া থেকে রানা রউফ ওরফে ওয়াহাব আলমকে গ্রেপ্তার করে STF। তদন্তকারীদের দাবি, তিনি পাকিস্তানের ফয়সলাবাদের বাসিন্দা এবং ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করে কলকাতায় বসবাস করছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভারতের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রানা-কাণ্ডের তদন্তে এর আগে তপসিয়া থেকেই মহম্মদ ইজাজ নামে আরও এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের দাবি, রানার জন্য ভারতীয় পরিচয়পত্র তৈরির সঙ্গে তাঁরও যোগ ছিল। এ বার সেই সূত্র ধরেই ইমরানের নাম সামনে আসে। ফলে রানা রউফকে কেন্দ্র করে কলকাতায় একটি বড় নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।
তদন্তকারীদের প্রাথমিক অভিযোগ, রানা ভারতে নিজের পরিচয় আরও শক্ত করার জন্য ভারতীয় পাসপোর্ট তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। সেই প্রক্রিয়ায় ইমরানের সাহায্য নেওয়া হয়েছিল বলে STF-এর দাবি। ইমরান ভুয়ো নথিপত্র তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন কি না এবং সেই নথি ব্যবহার করে আরও কারও পরিচয় তৈরি করা হয়েছে কি না, তা জানতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইছেন তদন্তকারীরা।
রানা রউফকে ঘিরে তদন্ত ইতিমধ্যেই জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। STF-এর হাতে তাঁর কাছ থেকে পাকিস্তানি পাসপোর্টের তথ্য এবং একাধিক আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সূত্র পাওয়ার কথা সামনে এসেছে। তদন্তকারীরা তাঁর নেপাল, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান-যোগও খতিয়ে দেখছেন।
এর আগে তদন্তে আরও জানা গিয়েছিল, রানা কলকাতায় ‘ওয়াহাব আলম’ নামে পরিচয় তৈরি করেছিলেন। তপসিয়ার ঠিকানা ব্যবহার করে তাঁর নামে ভারতীয় নথি তৈরির অভিযোগও সামনে এসেছে। ২০১৮ সালে তাঁর জন্য ভোটার পরিচয় তৈরিতে ইজাজের ভূমিকা ছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি। বিধানসভা ভোটের আগে SIR প্রক্রিয়ায় সেই নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে বলেও জানা গিয়েছে।
রানা রউফের কাছ থেকে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের ছবি ও মানচিত্র উদ্ধারের বিষয়টিও তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ভারতীয় সেনার ইস্টার্ন কমান্ডের সদর দফতর হিসেবে ফোর্ট উইলিয়াম অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা। সেনা ও বিএসএফের গতিবিধি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
ইমরানকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তকারীদের নজর এখন তাঁর যোগাযোগের তালিকায়। এই নেটওয়ার্কে আরও কারা যুক্ত, ভুয়ো নথি তৈরির কাজে আর কোনও চক্র সক্রিয় কি না এবং সীমান্তপারের কোনও যোগাযোগ ছিল কি না—সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ সূত্রে আরও কয়েকজনের সন্ধান চালানোর কথা জানা গিয়েছে।
কলকাতাকে কেন্দ্র করে ‘স্লিপার সেল’ তৈরির পরিকল্পনা ছিল বলে যে অভিযোগ সামনে এসেছে, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এই দাবির পূর্ণ সত্যতা এবং পরিকল্পনাটি কতটা এগিয়েছিল, তা এখনও তদন্তাধীন। ইমরানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে রানা রউফের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, নথি তৈরির নেটওয়ার্ক এবং সম্ভাব্য অন্য সহযোগীদের বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করবে STF।
রানা রউফের গ্রেপ্তারের পর একের পর এক সহযোগীর নাম সামনে আসায় তদন্তের পরিধিও বাড়ছে। তপসিয়া থেকে ইমরানের গ্রেপ্তারি সেই তদন্তেই নতুন সংযোগ তৈরি করল। এখন গোয়েন্দাদের মূল লক্ষ্য, এই নেটওয়ার্কের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে ভুয়ো নথি, বিদেশি যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য গুপ্তচরবৃত্তির পুরো চক্রটি কতটা বিস্তৃত ছিল, তা স্পষ্ট করা।



