দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার–কে অপসারণের দাবিতে সংসদে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনার পথে হাঁটতে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। মঙ্গলবার বিকেলে সংসদের দুই কক্ষের তৃণমূল সাংসদদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সূত্রের খবর, সেখানেই দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সাংসদদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন—জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনতে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও সংসদীয় প্রস্তুতি অবিলম্বে শুরু করতে হবে।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার একটি সাংবিধানিক পদ। সংবিধান অনুযায়ী, এই ধরনের পদে অধিষ্ঠিত কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনতে হলে সংসদের অন্তত ১০০ জন সাংসদের স্বাক্ষর প্রয়োজন। বর্তমানে লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে তৃণমূলের সাংসদ সংখ্যা ৪১ (মৌসম বেনজির নুর ইস্তফার পর)। ফলে একার পক্ষে নয়, সমমনস্ক বিরোধী দলগুলির সমর্থন নিয়েই এই পথে এগোতে হবে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলকে।


তৃণমূলের কৌশল এখানেই। বিজেপি-বিরোধী সর্বভারতীয় মঞ্চ INDIA–ভুক্ত দলগুলির সাংসদদের কাছেই প্রথমে স্বাক্ষর চাইতে চায় তারা। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই প্রক্রিয়ায় সই পড়লে জাতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী রাজনীতিতে তৃণমূলের অবস্থান আরও শক্ত হবে। অন্য দিকে, যদি কোনও দল পিছিয়ে থাকে, তবে তাদের বিজেপি-বিরোধিতার সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাবে তৃণমূল।
বিরোধী শিবিরে সংখ্যার অঙ্ক
সংসদীয় হিসেবে সবচেয়ে বড় শক্তি কংগ্রেস। লোকসভায় কংগ্রেসের সাংসদ ৯৯ জন, রাজ্যসভায় ২৭ জন—মোট ১২৬ জন। কংগ্রেস সমর্থন দিলে একাই ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার সীমা ছুঁয়ে ফেলা সম্ভব।
এর পরেই রয়েছে সমাজবাদী পার্টি। অখিলেশ যাদব–এর দলের লোকসভায় ৩৭ জন এবং রাজ্যসভায় ৪ জন—মোট ৪১ জন সাংসদ। সম্প্রতি কলকাতায় এসে নবান্নে মমতার সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পর, এই সমর্থন নিয়ে তৃণমূল যথেষ্ট আশাবাদী।


তামিলনাড়ুর শাসকদল ডিএমকে–র লোকসভায় ২২ জন ও রাজ্যসভায় ১০ জন—মোট ৩২ জন সাংসদ রয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এম কে স্ট্যালিন–এর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্কের কথা মাথায় রেখেই এই সমর্থনের সম্ভাবনা দেখছে তৃণমূল।
এ ছাড়া বিহারের প্রধান বিরোধী দল আরজেডি–র লোকসভায় ৪ জন এবং রাজ্যসভায় ৫ জন, মোট ৯ জন সাংসদ রয়েছেন। তেজস্বী যাদব–এর দলের সমর্থন মিললে বিরোধী শিবিরের সংখ্যাগত শক্তি আরও বাড়বে।
➡️ সব মিলিয়ে এই দলগুলি একজোট হলে ২০০–র বেশি সাংসদের সমর্থন পাওয়া সম্ভব—যা ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব তোলার জন্য যথেষ্ট।
‘পাশ করানো নয়, রাজনৈতিক বার্তা’
তৃণমূল নেতৃত্ব ভাল করেই জানে, বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ–র সাংসদ সংখ্যার নিরিখে এই প্রস্তাব সংসদে পাশ হওয়ার সম্ভাবনা কার্যত নেই। তবু সংসদীয় গণতন্ত্রের বুনিয়াদি নিয়ম মেনেই এই পথে হাঁটতে চাইছে তারা। দলের অন্দরের বক্তব্য, এই ইমপিচমেন্ট উদ্যোগের মাধ্যমে সংসদে বিজেপির অবস্থান এবং নির্বাচন কমিশন নিয়ে তাদের ভূমিকা ‘উন্মোচিত’ করা যাবে।
এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী দলগুলির আপত্তি থাকলেও, তৃণমূলের মতো উচ্চগ্রামে সুর আর কেউ বাঁধেনি। নির্বাচন কমিশনের সদর দফতর পর্যন্ত গিয়ে ‘আক্রান্ত’দের নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি করেছে একমাত্র তৃণমূলই। মঙ্গলবার এই বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য এড়িয়ে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বাকি বিরোধী দলগুলির সমর্থন নিশ্চিত করতেই সচেতন ভাবেই তিনি নীরবতা বজায় রেখেছেন।
উল্লেখ্য, জাতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রতিক কালে ইমপিচমেন্ট নিয়ে বড় আলোড়ন তৈরি হয়েছিল গত বছরের জুলাই মাসে। ইলাহাবাদ হাই কোর্টের বিচারপতি যশবন্ত বর্মার বিরুদ্ধে রাজ্যসভায় আনা প্রস্তাব, তৎকালীন চেয়ারম্যান তথা উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়–এর আচমকা ইস্তফার পর ভেস্তে যায়। সেই অভিজ্ঞতার পরেও তৃণমূল কতদূর এগোতে পারে, সেটাই এখন জাতীয় রাজনীতির বড় প্রশ্ন।







