স্টারলিঙ্ক নিয়ে মাস্কের ‘অলিগার্ক’ অভিযোগ খারিজ কেন্দ্রের, ‘ভারতে বৈষম্যমূলক নিয়ম নেই’

স্টারলিঙ্কের ভারতে প্রবেশে ‘অলিগার্ক’রা বাধা দিচ্ছে বলে ইলন মাস্কের অভিযোগের পর পাল্টা জবাব দিল কেন্দ্র। তিন স্যাটেলাইট সংস্থাই একই নিয়ন্ত্রক পর্যায়ে বলে জানাল মন্ত্রক।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ভারতে স্টারলিঙ্কের (Starlink) পরিষেবা চালুর পথে ‘কিছু অলিগার্ক’ বাধা দিচ্ছে বলে ইলন মাস্কের (Elon Musk) অভিযোগ ঘিরে সরাসরি অবস্থান জানাল কেন্দ্র। যোগাযোগ মন্ত্রক (Ministry of Communications) বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, দেশের স্যাটেলাইট যোগাযোগ পরিষেবার অনুমোদন কাঠামো ন্যায্য এবং বৈষম্যহীন। সরকারের বক্তব্য, বর্তমানে স্টারলিঙ্ক-সহ তিনটি সংস্থাই প্রায় একই নিয়ন্ত্রক পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা সংক্রান্ত যাচাই চলছে।

বুধবার সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টের জবাবে মাস্ক দাবি করেছিলেন, ভারতে স্টারলিঙ্ককে আটকে রাখা হচ্ছে কিছু ‘অলিগার্ক’-এর স্বার্থ রক্ষা করতে। কারও নাম অবশ্য করেননি তিনি। তাঁর অভিযোগ ছিল, এই ব্যবসায়িক স্বার্থগুলি ভারতের যোগাযোগ ক্ষেত্রে নিজেদের ‘একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ’ বজায় রাখতে চাইছে।

মাস্কের সেই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সরকারি অবস্থান সামনে এল। যোগাযোগ মন্ত্রক জানিয়েছে, স্যাটেলাইট যোগাযোগ-সহ সমস্ত টেলিকম পরিষেবার জন্য একই ধরনের অনুমোদন কাঠামো রয়েছে। সরকারের দাবি, সেই কাঠামো কোনও নির্দিষ্ট সংস্থাকে সুবিধা বা অসুবিধা দেওয়ার জন্য তৈরি নয়।

সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতে নন-জিওস্টেশনারি অরবিট বা NGSO-ভিত্তিক GMPCS (Global Mobile Personal Communications by Satellite) পরিষেবার জন্য তিনটি সংস্থাকে টেলিকম লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। তারা হল স্টারলিঙ্ক, রিলায়েন্স জিও (Reliance Jio) এবং ওয়ানওয়েব (OneWeb)। তিন সংস্থার ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত পূরণের প্রক্রিয়া চলছে।

এখানেই সরকারের পাল্টা যুক্তি। যোগাযোগ মন্ত্রকের বক্তব্য, কোনও সংস্থার নিরাপত্তা মূল্যায়ন শেষ হলেই তারা পরবর্তী ধাপে স্পেকট্রাম বরাদ্দের জন্য আবেদন করতে পারবে। অর্থাৎ লাইসেন্স পাওয়া মানেই সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যিক পরিষেবা শুরু করার অনুমতি নয়। নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করাও বাধ্যতামূলক।

সরকার আরও জানিয়েছে, এই মুহূর্তে তিনটি সংস্থাই ‘ব্রডলি একই নিয়ন্ত্রক পর্যায়ে’ রয়েছে। ফলে স্টারলিঙ্কের ক্ষেত্রে নিয়ম বা তার প্রয়োগ বৈষম্যমূলক—এমন দাবি ভিত্তিহীন এবং ভুল ধারণার উপর তৈরি বলে মন্ত্রকের বক্তব্য।

মাস্কের মন্তব্যের নেপথ্যে রয়েছে ভারতে স্টারলিঙ্কের পরিষেবা চালুর দীর্ঘ অপেক্ষা। স্টারলিঙ্ক ইতিমধ্যেই ভারতে পরিষেবা দেওয়ার জন্য পরিকাঠামো তৈরির কথা জানিয়েছে। বুধবার ইন্ডিয়া মোবাইল কংগ্রেসে (India Mobile Congress 2026) সংস্থার বিজনেস অপারেশন্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট লরেন ড্রেয়ার জানান, ভারতে তারা ২০টি গেটওয়ে সাইট তৈরি করেছে। ভারতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রয়োজন মেনে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ড্রেয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, স্টারলিঙ্ক ভারতে পরিষেবা চালু হলে দেশের প্রত্যন্ত এবং এখনও দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ থাকা এলাকাগুলিতে বিকল্প সংযোগ দিতে পারে। তবে বাণিজ্যিক পরিষেবা শুরু করতে ভারতীয় নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অনুমোদন এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।

স্টারলিঙ্কের ভারত-প্রবেশের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ স্যাটেলাইট ইন্টারনেট দেশের এমন সব এলাকায় উচ্চগতির সংযোগ পৌঁছে দিতে পারে, যেখানে ফাইবার বা প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছনো তুলনামূলক কঠিন। সরকারি নথিতেও স্যাটেলাইট-ভিত্তিক যোগাযোগকে গ্রাম, সীমান্ত, পাহাড়ি, উপকূলীয় এবং অন্যান্য অনুন্নত এলাকায় সংযোগ বাড়ানোর সম্ভাব্য মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ভারতের টেলিকম বাজারে স্টারলিঙ্ক একা নয়। মুকেশ অম্বানীর রিলায়েন্স জিও এবং সুনীল ভারতী মিত্তলের সঙ্গে যুক্ত ওয়ানওয়েবও স্যাটেলাইট যোগাযোগ পরিষেবা দেওয়ার অনুমোদন পেয়েছে। ফলে মহাকাশ-ভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবার বাজারে একাধিক সংস্থার প্রবেশের প্রস্তুতি চলছে।

মাস্ক তাঁর পোস্টে কোনও সংস্থা বা শিল্পপতির নাম না করলেও, ভারতের টেলিকম বাজারে বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আধিপত্যের প্রেক্ষাপটেই তাঁর মন্তব্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে, স্টারলিঙ্ক-সহ লাইসেন্সপ্রাপ্ত তিন সংস্থার ক্ষেত্রেই একই ধরনের নিরাপত্তা যাচাই চলছে। তাই কোনও নির্দিষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থা স্টারলিঙ্ককে আটকে রাখছে—এমন দাবির কোনও সরকারি স্বীকৃতি নেই।

এখন মূল বিষয় হল নিরাপত্তা মূল্যায়ন কবে শেষ হয় এবং তার পরে স্পেকট্রাম বরাদ্দের প্রক্রিয়া কত দ্রুত এগোয়। কারণ লাইসেন্স পাওয়ার পরেও পরিষেবা চালুর জন্য এই ধাপগুলি পেরোতে হবে। ফলে ভারতে স্টারলিঙ্ক কবে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য পরিষেবা শুরু করতে পারবে, তার উত্তর এখনও নির্ভর করছে বাকি নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ার উপর।

মাস্কের অভিযোগ এবং কেন্দ্রের পাল্টা বক্তব্যে আপাতত স্পষ্ট হয়েছে একটি বিষয়—স্টারলিঙ্কের ভারতে প্রবেশ আটকে থাকার কারণ নিয়ে সংস্থার অভিযোগের সঙ্গে সরকারের ব্যাখ্যার সরাসরি অমিল রয়েছে। মাস্ক যেখানে ব্যবসায়িক স্বার্থের বাধার কথা বলছেন, সেখানে কেন্দ্র বলছে, সব লাইসেন্সধারীর জন্য একই নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া চলছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন