শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরি বনে আপাতত থমকে রয়েছে সময়। একদিকে প্রকৃতি রক্ষার জোরালো দাবি, অন্যদিকে হাজার হাজার হস্তশিল্পীর জীবিকার প্রশ্ন—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে সোনাঝুরি হাটের ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত। জাতীয় পরিবেশ আদালতের চূড়ান্ত রায় পিছিয়ে যাওয়ায় আগামী ২ এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা বাড়ল। আর সেই অপেক্ষার সঙ্গে বাড়ছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও জল্পনা।
মঙ্গলবার জাতীয় পরিবেশ আদালতে চূড়ান্ত রায় হওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে যাওয়ায় আপাতত কোনও দিশা মিলছে না। ফলে শান্তিনিকেতনজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন—Sonajhuri Haat আদৌ চালু থাকবে তো? নাকি পরিবেশগত কারণে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এই জনপ্রিয় হস্তশিল্পের হাট?
সোনাঝুরি হাট ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশ দূষণের অভিযোগ উঠে আসছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছে যত্রতত্র প্লাস্টিক ও জঞ্জাল ফেলা, অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নিষ্কাশন, গাছ কাটা, বনভূমির ক্ষতি এবং অতিরিক্ত ভিড়ের ফলে শব্দদূষণ। সপ্তাহে প্রায় ছয় দিন হাট বসায় সোনাঝুরি বনাঞ্চলে মানুষের চাপ ক্রমেই বেড়েছে বলেও অভিযোগ।

এই সব অভিযোগ তুলে পরিবেশকর্মী Subhas Dutta দ্বারস্থ হন National Green Tribunal-এর। মামলার প্রেক্ষিতে রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ ও বনদপ্তর আদালতে হলফনামা জমা দেয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, বনদপ্তরের জমি দখল করে একাধিক রিসর্ট ও হোটেল গড়ে উঠেছে, যাদের অনেকেরই বৈধ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ছাড়পত্র নেই। পাশাপাশি নিয়মিতভাবে অপরিশোধিত বর্জ্য জঙ্গলের মধ্যে ফেলার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্তের বক্তব্য, “রায় পিছিয়ে যাওয়ার ফলে সোনাঝুরি এলাকায় পরিবেশের ক্ষতি অব্যাহত রয়েছে। পরিবেশ কারও জন্য অপেক্ষা করে না। এখানে শুধু প্রকৃতিই নয়, মানুষেরও ক্ষতি হচ্ছে।”
অন্যদিকে, হাট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁদের বক্তব্য, এই হাটকে কেন্দ্র করেই বহু পরিবারের রুজিরোজগার চলে। ২০১৬-১৭ সাল থেকে হাটের পরিসর ব্যাপকভাবে বেড়েছে। নথিভুক্ত ব্যবসায়ীর সংখ্যা যেখানে প্রায় ১,৮০০, বাস্তবে সেখানে চার হাজারেরও বেশি ব্যবসায়ী বসেন বলে অভিযোগ। বনদপ্তরের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে অভিযান চালানো হলেও কিছুদিন পর ফের অনিয়ম শুরু হয়—এমন অভিযোগও তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
প্রসঙ্গত, ২০০০ সালে কয়েকজন স্থানীয় আদিবাসী শিল্পী ও আশ্রমকন্যা শ্যামলী খাস্তগীরের উদ্যোগে সপ্তাহে একদিন শনিবারে শুরু হয়েছিল সোনাঝুরি হাট। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা হয়ে ওঠে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। আজ স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি কলকাতা, বর্ধমান, বাঁকুড়া ও মুর্শিদাবাদ থেকেও শিল্পীরা এখানে পসরা সাজান।
হাট ব্যবসায়ী ইনসান মল্লিক ও তন্ময় মিত্রের কথায়, “সোনাঝুরি হাট বনদপ্তরের নিয়ম মেনেই চলে। এটি শুধু হাট নয়, হাজার হাজার শিল্পীর জীবনের ভরসা। কোনও ভাবেই এই হাট বন্ধ করা উচিত নয়।”
এ বিষয়ে বনদপ্তরের ডিএফও Rahul Kumar বলেন, “বিষয়টি সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার অধীনে রয়েছে। এই মুহূর্তে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।”
সব মিলিয়ে, দূষণ বনাম জীবিকা—এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে সোনাঝুরি হাট। পরিবেশ রক্ষার দাবি ও হাট বাঁচানোর লড়াইয়ের মাঝে আপাতত তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে ২ এপ্রিলের দিকে। সেই রায়ই ঠিক করবে সোনাঝুরি হাটের ভবিষ্যৎ পথ।



