রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও ত্রুটিমুক্ত করতে বড় পদক্ষেপ করল নির্বাচন কমিশন। কমিশন পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিশেষ ভাবে একজন স্পেশাল রোল অবজার্ভার নিয়োগ করেছে। দায়িত্ব পেয়েছেন ১৯৯০ ব্যাচের আইএএস অফিসার সুব্রত গুপ্ত। পাশাপাশি রাজ্যের প্রতিটি জেলায় আলাদা করে নির্বাচনী রোল অবজার্ভারও নিয়োগ করা হয়েছে, যাতে এসআইআর প্রক্রিয়া জমা দেওয়া থেকে ডিজিটাইজেশন—সব ধাপে কোনও ভুল বা পক্ষপাতিত্ব না থাকে।
নির্বাচনী দফতর জানিয়েছে, ১২টি বড় জেলার জন্য ১২ জন অভিজ্ঞ আইএএস অফিসারকে রোল অবজার্ভার পদে নিযুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের কাজ হবে জেলা শাসক তথা ডিইওদের কাজ পর্যবেক্ষণ করা এবং ইআরওদের দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা। মূল লক্ষ্য—এসআইআর প্রক্রিয়া যেন কমিশনের নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই চলে। কমিশন একই সঙ্গে জানিয়ে দিয়েছে, কোনও রাজনৈতিক দল সিইও-র সঙ্গে দেখা করতে চাইলে আগে থেকেই সময় নিতে হবে; হঠাৎ সাক্ষাৎ নয়।


রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে নয়া রোল অবজার্ভার নিয়োগ করল কমিশন
এদিকে এসআইআর-এর পরিসংখ্যান ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত রাজ্যে মোট ২৭ লক্ষ ৭১ হাজার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এর মধ্যে মৃত প্রায় ১৫ লক্ষ। নিখোঁজ প্রায় ২.৬১ লক্ষ। স্থানান্তরিত ভোটারের সংখ্যা ৮.৮৮ লক্ষ। ডুপ্লিকেট ভোটারও রয়েছে ৫৮ হাজার ১৬৪ জন। নির্বাচনী ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, কারণ বহু বছর ধরেই বিরোধীরা অভিযোগ তুলছিল যে ভোটার তালিকায় মৃত ও স্থানান্তরিত বহু নাম রয়েছে।

জাতীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, ১২টি রাজ্যে একযোগে এসআইআর প্রক্রিয়া চলছে। বড় রাজ্যগুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ডিজিটাইজেশনে সবার উপরে—৮৭.৯১ শতাংশ ফর্ম ইতিমধ্যে ডিজিটাইজড। বাংলায় মোট ডিজিটাইজড ভোটার তথ্যের সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ৭৩ লক্ষ ৬৮ হাজার। শুক্রবার দুপুর তিনটে পর্যন্ত মোট জমা পড়েছে ৭ কোটি ৬৫ লক্ষ ৫ হাজার ৯৮৫টি ফর্ম, যা প্রায় ৯৯.৮৩ শতাংশ।
কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, ফর্ম ৬, ৭ এবং ৮ অনলাইনে জমা দিতে গেলে আধারভিত্তিক ই-সই এখন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যার ফলে ভুয়ো জমাদানের সম্ভাবনা কমবে এবং এসআইআর প্রক্রিয়া আরও সুরক্ষিত হবে।


তবে জেলার ভিত্তিতে ডিজিটাইজেশনের হার সমান নয়। শহর ও শহরতলি ঘেরা উত্তর ২৪ পরগনায় ডিজিটাইজেশন হয়েছে ৭৯ শতাংশ এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৮৪ শতাংশ। কলকাতা উত্তর ও দক্ষিণে হার তুলনামূলক কম—৬১ ও ৬৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতা মহানগরে হাই-ডেনসিটি জনসংখ্যা, বিভিন্ন ওয়্যার্ডের ফর্ম-সাবমিশন জটিলতা এবং ঠিকানা পরিবর্তনের হার বেশি হওয়ায় ডিজিটাইজেশনের গতি কম।
সিইও দফতর জানিয়েছে, খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর মৃত, স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত, ডুপ্লিকেট এবং নিখোঁজ ভোটারের পৃথক তালিকা প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি, যে এনুমারেশন ফর্ম জমা পড়েনি, সেটিও আলাদা ক্যাটেগরিতে প্রকাশ হবে, যাতে অনিয়ম থাকলে তা দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার কমিশনের মূল বার্তা পরিষ্কার—এসআইআর প্রক্রিয়া কোনওভাবেই রাজনৈতিক বিতর্কের মাঝখানে আটকে থাকবে না। শুরু থেকে শেষ—প্রতিটি ধাপের ওপর নজর রাখবেন নিয়োগপ্রাপ্ত রোল অবজার্ভাররা। এর ফলে ভোটার তালিকা আরও নিখুঁত, নির্ভুল ও নিরপেক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।
রাজনীতির উত্তাপে যখন এসআইআর নিয়ে প্রতিদিনই নতুন অভিযোগ উঠছে, তখন কমিশনের এই কঠোর পর্যবেক্ষণ ও অতিরিক্ত নজরদারি নিঃসন্দেহে রাজ্যের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।








