ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) নিয়ে রাজ্যে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক উত্তাপ। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে মঙ্গলবার রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়াল-এর দফতরে সর্বদল বৈঠক বসে। দীর্ঘ বৈঠকে আধার কার্ড, এনুমারেশন ফর্ম ও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নানা প্রশ্নে তৈরি হয় বাগ্বিতণ্ডা।
তৃণমূল, বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস— সবাই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে জানায়। রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি মন্তব্যে যখন সভা উত্তপ্ত, তখন সিইও মনোজকুমার আগরওয়ালের বক্তব্যে নতুন মাত্রা যোগ হয়। তিনি বলেন, “আমি এখানে পোস্ট অফিসের ভূমিকায় আছি। কারও অভিযোগ বা পরামর্শ লিখিত আকারে দিন, আমি দিল্লিতে পাঠিয়ে দেব।”


তৃণমূলের অভিযোগ: বৈঠকে তৃণমূলের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও মেয়র ফিরহাদ হাকিম। অরূপ বিশ্বাস অভিযোগ করেন, “এসআইআর নিয়ে মানুষ ভয় পাচ্ছেন, আত্মহত্যাও করছেন। এর দায় কমিশনের। ২০০২ সালে এই প্রক্রিয়া দুই বছর ধরে হয়েছিল, এখন হঠাৎ দুই মাসে শেষ করতে চাওয়া কেন?”
তিনি আরও বলেন, “কমিশনের উচিত আগে নিজেদের জন্ম শংসাপত্র জমা দেওয়া, তারপর সাধারণ মানুষকে জবাবদিহি করা। এই SIR হল CAA ও NRC-র পূর্বপরিকল্পনা। প্রয়োজনে আমরা আইনি পদক্ষেপ নেব।”
ফিরহাদ হাকিমও সুর চড়ান— “বাংলার একটাও বৈধ ভোটারের নাম বাদ গেলে আমরা প্রতিবাদে সরব হব। প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত ইস্তফা দিতে হবে যদি নাগরিকেরা ভোট না দেন!” তাঁর অভিযোগ, “কমিশন-বিজেপি ভাই ভাই হয়ে কাজ করছে। পরিযায়ী পরিবারদের সই নিলে সেটি ‘মান্যতা’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।”


বিজেপির পাল্টা দাবি: বৈঠকে বিজেপির তরফে ছিলেন শিশির বাজোরিয়া। তাঁর দাবি, “তৃণমূল এখন নির্ভুল ভোটার তালিকার কথা বলছে। অথচ, এর আগে এসআইআরের বিরোধিতা করে পাঁচ লক্ষ লোক নিয়ে দিল্লি যাওয়ার কথা বলেছিল। আত্মহত্যার দায় আসলে মুখ্যমন্ত্রীর, কারণ মানুষকে ভয় দেখানো হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “৬ হাজার ভুল নাম এসেছে বিএলওদের থেকে। প্রশান্ত কিশোরের নাম দুই রাজ্যের ভোটার তালিকায় কীভাবে আছে, সেটার উত্তর দিক তৃণমূল। আমরা SIR প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানাই।”
বামেদের প্রশ্ন: সিপিআইএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বৈঠকের পর বলেন, “আমার মনে হচ্ছে, এসআইআর নিয়ে সিইও প্রস্তুতই নন। অনেক প্রশ্নের উত্তর তিনি দিতে পারেননি। কমিশনের কাজ ভোটার তালিকা তৈরি করা, নাগরিকত্ব নির্ধারণ নয়।”
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “কমিশন ১২টি নথির কথা বলছে। বাকি ১১টি নথি নাগরিকত্ব প্রমাণ করে— এটা কে ঠিক করল? ২০০২ সালের তালিকা কেন ধরা হল? এই সবের কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।”
সিইওর সাফ বার্তা: সকল পক্ষের বক্তব্য শোনার পর মনোজকুমার আগরওয়াল বলেন, “সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। বুথভিত্তিক এজেন্ট নিয়োগে রাজনৈতিক দলগুলোকে সক্রিয় হতে হবে।”
তিনি জানান, আগামী ৩ নভেম্বর পর্যন্ত বিএলওদের প্রশিক্ষণ চলবে। প্রতিটি ভোটারের জন্য আলাদা কিউআর কোড তৈরি হবে। বাংলায় মোট ৭.৬৬ কোটি ভোটার রয়েছেন, এবং প্রত্যেক ভোটারের বাড়িতে গিয়ে তথ্য নেওয়া হবে।
তবে সবচেয়ে আলোচিত বক্তব্যটি তাঁর শেষ মন্তব্য— “আমি এখানে পোস্ট অফিসের ভূমিকায়।” অর্থাৎ, রাজ্য নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শুধু তথ্য সংগ্রহ ও প্রেরণ, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দায় নয়।
বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, SIR বা Special Intensive Revision নিয়ে ততই বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা। কেউ বলছে এটি NRC-র ছদ্মরূপ, কেউ বলছে এটি ভোটার তালিকা পরিশুদ্ধ করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এখন দেখার বিষয়— এই বিতর্ক কোথায় গিয়ে শেষ হয়, আর আদৌ তা ভোটের ময়দানে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।







