রাজ্যজুড়ে চলা এসআইআর বা Special Intensive Revision (SIR)-এর অতিরিক্ত কাজের চাপ নিয়ে বহুদিন ধরেই ক্ষোভ জমা হচ্ছিল মাঠ-পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে। সেই চাপ এবার মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে আনল জলপাইগুড়ির মালবাজারে। বাড়ির উঠোন থেকে উদ্ধার হল এক মহিলা বিএলও-র ঝুলন্ত দেহ। মৃতার পরিবারের অভিযোগ—এসআইআরের কাজের প্রবল চাপই তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়, আর সেই চাপই শেষ পর্যন্ত নিয়ে যায় চরম সিদ্ধান্তে।
মৃতার নাম শান্তিমণি এক্কা। মালবাজারের রাঙামাটি পঞ্চায়েতের বাসিন্দা। সম্প্রতি তাঁকে এসআইআরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বিএলও হিসেবে তাঁর কাজ ছিল বাড়ি-বাড়ি গিয়ে SIR ফর্ম বিলি করা, সংগ্রহ করা, তথ্য যাচাই করা এবং প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়া। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত কাজ তাঁর দৈনন্দিন জীবন ও স্বাস্থ্যে ব্যাপক চাপ তৈরি করেছিল। তাঁর পরিবারের দাবি, শান্তিমণি ধীরে ধীরে চরম অবসাদে ভুগতে শুরু করেন।


এসআইআরের অতিরিক্ত কাজের চাপ! মালবাজারে বিএলও-র মর্মান্তিক মৃত্যুতে চাঞ্চল্য
বুধবার সকালে পরিবারের সদস্যরা বাড়ির উঠোনে তাঁর ঝুলন্ত দেহ দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠিয়েছে। প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যা বলেই মনে করা হলেও, কেন তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিলেন—তা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
ঘটনার খবর পেয়ে মৃতার বাড়িতে যান অনগ্রসর শ্রেণী কল্যাণ মন্ত্রী বুলুচিক বড়াইক। পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি। তবে তাঁর সফরের পরেও স্থানীয় মানুষের প্রশ্ন—এই বিশাল প্রশাসনিক কর্মসূচিতে বিএলওদের নিরাপত্তা, সময়সীমা, ছুটি-সুবিধা কিংবা মানসিক চাপ সম্পর্কিত নির্দেশিকা কি যথেষ্ট?

রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মীদের অভিযোগ, এসআইআর-এর কাজের চাপ অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক বিএলওকে তাঁদের মূল অফিসের দায়িত্ব শেষ করে সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত বাড়ি-বাড়ি ফর্ম বিলি করতে হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে, দেশছাড়া হওয়ার আতঙ্কে সাধারণ মানুষের আতঙ্ক-সংকট সামলাতেও তাঁদের অতিরিক্ত চাপ নিতে হচ্ছে।


শান্তিমণি এক্কার এই মর্মান্তিক ঘটনা তাই আরও বড় প্রশ্ন তুলছে—এই বিশাল ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় মাঠকর্মীদের মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তা কি যথাযথভাবে নিশ্চিত হয়েছে?
রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় এসআইআরের কাজের চাপের জেরে পূর্বেও একাধিক মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছিল। প্রতিবারই প্রশাসন তদন্তের আশ্বাস দিলেও, বাস্তবে মাঠকর্মীদের পরিস্থিতির বিশেষ পরিবর্তন হয়নি বলেই অভিযোগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো প্রশাসনিক কর্মসূচি সফল করতে হলে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নিরাপত্তা, সময় ও মানুষের সঙ্গে আচরণসংক্রান্ত বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি। এসআইআর-এর মতো বিশাল দায়িত্ব কোনও কোনও কর্মীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করলে তার ক্ষতিকর প্রভাব পড়তেই পারে।
শান্তিমণির মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, বহু বিএলও-র সার্বিক সমস্যার প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন উঠছে—এই মৃত্যুর পরে কি প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে? নাকি মাঠকর্মীদের ওপর চাপ আরও বাড়বে?
ফলে, এসআইআর নিয়ে রাজ্যজুড়ে যে নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি হয়েছে, শান্তিমণির মৃত্যু সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে দিল।








