উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়ায় SIR আতঙ্ককে কেন্দ্র করে এক মর্মান্তিক আত্মহত্যার ঘটনা ফের জনমনে তীব্র আলোড়ন তুলেছে। সরকারি নথির ভুল এবং সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তায় ভুগে শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথ বেছে নিলেন যদুরহাটি এলাকার বাসিন্দা শফিকুল মণ্ডল। বয়স হয়েছিল ৫৭ বছর। পরিবারের অভিযোগ, বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR কার্যকর হলে কী হবে, এই ভয় ও অনিশ্চয়তা তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়।
ঘটনার পর থেকেই বাদুড়িয়া জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে রাজনৈতিক দল—সকলের মধ্যেই ঘটনায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। শফিকুলের মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের নয়, SIR–কে ঘিরে সাধারণ মানুষের অস্থিরতারও প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
শফিকুলের পরিবারের দাবি, তাঁরা বহু প্রজন্ম ধরে বাদুড়িয়ার বাসিন্দা। তবে নথিতে দেখা যায়, দ্বিতীয় স্ত্রী—যাঁর পরিচয়পত্র দিয়ে পরিবারের নানা সরকারি কাজ হয়েছিল—তার বয়স প্রথম পক্ষের সন্তানদের তুলনায় কম দেখানো আছে। এই অস্বাভাবিক বয়স ব্যবধান নিয়েই শুরু হয় সন্দেহ।
এই ভুল কীভাবে সংশোধন করা যাবে, আদৌ সংশোধন হবে কি না—এ নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় ছিলেন শফিকুল। পরিবারের দাবি, তিনি পরপর ১৫ দিন ধরে বিভিন্ন সরকারি অফিসে দৌড়ঝাঁপ করলেও সঠিক তথ্য বা আশ্বাস কিছুই পাননি। ধীরে ধীরে তাঁর মনে তৈরি হয় ভয়, নথির ভুলের কারণে detention camp-এ পাঠানো হতে পারে তাঁকে। মূল SIR আতঙ্ক এখান থেকেই চরমে ওঠে।
গত পাঁচ-ছয় দিন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। পরিবারের অনুরোধ সত্ত্বেও খাবার স্পর্শ করছিলেন না তিনি। আত্মীয়-পরিজনেরা চেষ্টা করেও তাঁর মনের ভয় দূর করতে পারেননি। স্থানীয়দের কথোপকথন থেকেও পাওয়া যাচ্ছিল নানা গুজব—SIR কার্যকর হলে বহু পরিবার সমস্যায় পড়তে পারে, কেউ কেউ নাকি তালিকাবহির্ভূতও হয়ে যেতে পারেন। এই সমস্ত কথা আরও মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।
অবশেষে মঙ্গলবার দুপুরে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরের এক নির্জন স্থানে গিয়ে বিষপান করেন শফিকুল মণ্ডল। স্থানীয়রা বিষয়টি টের পেয়ে তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত বাদুড়িয়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টাতেও আর বাঁচানো যায়নি। বুধবার তাঁর দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় বসিরহাট মর্গে।
এ ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। পরিবারের বক্তব্য, তাঁদের নথিতে আসলে কোনও সমস্যাই নেই। আসল সমস্যাটি ছিল শফিকুলের মনের ভয়। তাঁর ছেলে জানান, “আমাদের ডকুমেন্টস সব ঠিক ছিল। কিন্তু বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীর বয়সের ব্যবধান নিয়েই সমস্যা হচ্ছিল। SIR ঘোষণার পর বাবা অস্বাভাবিকভাবে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। গত ১৫ দিন ধরে ছুটোছুটি করছিলেন। কিন্তু কোনও উত্তর পাচ্ছিলেন না।”
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যান স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব। তাঁদের অভিযোগ, বিজেপি অযথা ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করছে। পাল্টা বিজেপি দাবি করেছে, বিরোধী দলগুলি SIR নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে এবং এই আতঙ্ক অপ্রয়োজনীয়। দলটির পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে, SIR প্রক্রিয়া নিয়ে ভীত না হয়ে সঠিক তথ্য জেনে সিদ্ধান্ত নিতে।



