শ্রাবণ মাস (Shravan Month) এলেই বাঙালি মেয়েদের হাতে দেখা যায় সবুজ, লাল, হলুদ— কত রঙের কাঁচের চুড়ি। এটা শুধু সাজসজ্জার ব্যাপার নয়। বৈদিক জ্যোতিষ ও লোকাচার অনুযায়ী, শ্রাবণ মাসে কাঁচের চুড়ি পরার রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক ও জ্যোতিষীয় তাৎপর্য। বিশ্বাস করা হয়, এই এক মাস সঠিক নিয়মে কাঁচের চুড়ি পরলে শিবের (Lord Shiva) কৃপায় ভাগ্যের চাকা ঘুরে যেতে পারে। কিন্তু কোন রং কেন পরবেন, কবে পরবেন, কোথা থেকে কিনবেন— এই খুঁটিনাটি না জানলে ফল উল্টোও হতে পারে। আসুন জেনে নিই শ্রাবণ মাসে কাঁচের চুড়ি পরার সম্পূর্ণ নিয়ম।
শ্রাবণ মাসে কাঁচের চুড়ি কেন পরবেন?
কাঁচের চুড়ি নারীজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তবে শ্রাবণ মাসে এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। শিবপুরাণ মতে, কাঁচের চুড়ির শব্দ নাকি শিবের ধ্যান ভঙ্গ করে ভক্তের প্রতি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আবার জ্যোতিষশাস্ত্র বলছে, কাঁচের চুড়ি হাতে থাকলে মঙ্গল ও শুক্র গ্রহের অবস্থান শক্তিশালী হয়, যা নারীদের সৌভাগ্য, দাম্পত্যসুখ ও আর্থিক সমৃদ্ধি বয়ে আনে। যাঁরা অবিবাহিত, তাঁদের জন্যও এই চুড়ি শুভ বিবাহের যোগ তৈরি করে বলে মনে করা হয়।
কোন রঙের চুড়ি পরলে কী ফল পাবেন?
সবুজ কাঁচের চুড়ি (সবচেয়ে শুভ): শ্রাবণ মাসের সবুজ রং শিবের প্রিয়। এই রঙের চুড়ি পরলে দাম্পত্য জীবনে সুখ-শান্তি বজায় থাকে। অবিবাহিত মেয়েরা সবুজ চুড়ি পরলে শুভ বিবাহের সম্ভাবনা বাড়ে। সবুজ চুড়ি বুধ গ্রহকে শক্তিশালী করে, যা বুদ্ধি ও যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ায়।
লাল কাঁচের চুড়ি: লাল রং মঙ্গল গ্রহের প্রতীক। এই চুড়ি পরলে আত্মবিশ্বাস, সাহস ও কর্মস্পৃহা বাড়ে। বিবাহিত মহিলারা লাল চুড়ি পরলে স্বামীর আয়ু ও স্বাস্থ্য ভালো থাকে বলে বিশ্বাস। তবে যাঁদের মঙ্গল দুর্বল, তাঁরা লাল চুড়ি অবশ্যই পরবেন।
হলুদ কাঁচের চুড়ি: হলুদ বৃহস্পতি গ্রহের রং। এই চুড়ি পরলে সংসারে সুখ-সমৃদ্ধি বাড়ে। যাঁদের বৃহস্পতি দুর্বল বা যাঁরা পুজো-অর্চনা করেন, তাঁদের জন্য হলুদ চুড়ি অত্যন্ত শুভ।
সাদা কাঁচের চুড়ি: সাদা রং শুক্র ও চন্দ্রের প্রতীক। এই চুড়ি পরলে মানসিক শান্তি ও সৃজনশীলতা বাড়ে। যাঁরা শিল্প, সঙ্গীত বা সৃজনশীল পেশায় আছেন, তাঁদের জন্য সাদা চুড়ি আদর্শ।
সোনালি বা কমলা চুড়ি: সূর্যের প্রতীক এই রং। সম্মান, স্বীকৃতি ও আর্থিক উন্নতি চাইলে সোনালি চুড়ি পরতে পারেন।

কোন ভুল একেবারে করবেন না?
শ্রাবণ মাসে কাঁচের চুড়ি পরার কিছু কঠোর নিয়ম আছে, যা না মানলে উল্টো ফল হতে পারে।
-
ভাঙা চুড়ি পরবেন না: কখনও ভাঙা বা ফাটল ধরা কাঁচের চুড়ি হাতে রাখবেন না। এটা অশুভ এবং আর্থিক ক্ষতির ইঙ্গিত দেয়। চুড়ি ভেঙে গেলে সঙ্গে সঙ্গে খুলে ফেলুন এবং নতুন চুড়ি পরুন।
-
একটানা না খুলে থাকা: শ্রাবণ মাসে যত দিন সম্ভব হাতে চুড়ি পরে থাকুন। বিশেষ করে সোমবার, প্রদোষ বা শিবরাত্রিতে চুড়ি না খোলাই ভালো।
-
জোড় সংখ্যায় পরবেন না: সাধারণত ৫, ৭ বা ৯-এর মতো বিজোড় সংখ্যায় চুড়ি পরা শুভ। জোড় সংখ্যায় পরলে নাকি দাম্পত্য কলহ বাড়ে।
-
অন্য কারও চুড়ি পরবেন না: কারও পরানো চুড়ি নিজে পরবেন না। এতে অন্যের নেতিবাচক শক্তি আপনার শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
-
রাতে খোলার নিয়ম: রাতে ঘুমানোর সময় চুড়ি খুলতে চাইলে তা শ্রাবণ মাসে শুধুমাত্র স্নানের সময়ই খুলবেন। সারাদিন হাতে থাকা চুড়ি সন্ধ্যায় প্রদীপ দেখিয়ে তবেই পরুন।
কোথা থেকে কিনবেন, কী দেখে কিনবেন?
কাঁচের চুড়ি কেনার সময় খেয়াল রাখবেন— চুড়ি যেন টকটকে উজ্জ্বল রঙের হয়। ফ্যাকাশে বা মলিন রঙের চুড়ি কিনবেন না। কেনার পর বাড়িতে এনে গঙ্গাজল বা হলুদ জল দিয়ে ধুয়ে তবেই হাতে পরুন। শিবমন্দিরের সামনে থেকে চুড়ি কিনলে সবচেয়ে ভালো বলে মনে করা হয়।
কবে পরবেন?
শ্রাবণ মাসের প্রথম দিনেই নতুন কাঁচের চুড়ি পরা শুভ। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে প্রথম সোমবারে শিবের পুজো করে নতুন চুড়ি পরুন। চুড়ি পরার আগে শিবের পায়ে অর্পণ করে নিলে তা শিবের আশীর্বাদপুষ্ট হয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হল রাখি পূর্ণিমা (Rakhi Purnima) বা শ্রাবণী পূর্ণিমা— এই দিনেও নতুন চুড়ি পরা অত্যন্ত শুভ।
শ্রাবণ মাসের শেষ দিন পর্যন্ত এই চুড়ি পরার রেওয়াজ। মাস শেষে ওই চুড়ি খুলে পুকুর বা নদীর জলে বিসর্জন দেওয়ার প্রথা প্রচলিত আছে। বিশ্বাস, এর মাধ্যমে সারা বছরের দুঃখ-কষ্ট জলে ভেসে যায় এবং নতুন বছরের জন্য শুভ শক্তি আহ্বান করা হয়।
আরও পড়ুন:



