জুলাই গণহত্যা মামলায় হাসিনার ফাঁসির শাস্তি: কোন ‘দোষে’ এই রায়? বাংলাদেশের বহুল বিতর্কিত জুলাই গণহত্যা মামলায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফাঁসির শাস্তি ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায় পাঠ করে শোনান বিচারপতিরা। পাঁচটি অভিযোগের ভিত্তিতে তিনটি ধারায় হাসিনার দোষ প্রমাণিত হয়েছে বলে জানায় ট্রাইবুনাল। এই রায় ঘোষণার পর আদালতকক্ষে হাততালি পড়ে।
ট্রাইবুনাল জানিয়েছে, ছাত্র-যুব আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রাখার উদ্দেশ্যে হাসিনা যে নির্দেশগুলি দিয়েছিলেন, তা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এই জুলাই গণহত্যা মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক ভাষণ, পুলিশ-সেনাকে মারণাস্ত্র ব্যবহার করতে নির্দেশ দেওয়া এবং দমনপীড়ন আটকানোয় ব্যর্থতার অভিযোগ আনা হয়।


জুলাই গণহত্যা মামলায় হাসিনাকে কারাদণ্ড ও ফাঁসির শাস্তি! ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায়ে কী কী রয়েছে?
আত্মগোপনে থাকায় রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ নেই। ট্রাইবুনালের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিনি আপিল করতে চাইলে ৩০ দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে হবে। অভিযোগ অনুযায়ী তিনি বর্তমানে ভারতে রয়েছেন, এবং ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের কাছে পুনরায় প্রত্যর্পণের আবেদন করবে।

জুলাই গণহত্যা মামলার মূল অভিযোগ
রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারবিরোধী ছাত্র-যুব আন্দোলনের সময় হাসিনা সরাসরি পুলিশকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। ড্রোন, হেলিকপ্টার এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতিও তাঁর তরফ থেকে আসে। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ—এই নির্দেশের জেরেই প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত হন।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। আদালতে দাবি করা হয়, পুলিশ যে কাছ থেকে তাঁকে একাধিকবার গুলি করে, সেই নির্দেশও এসেছিল হাসিনার কাছ থেকেই। ঢাকার চানখাঁরপুল এলাকায় ছ’জন আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ট্রাইবুনালের পর্যবেক্ষণ—হাসিনা নির্দেশ না দিলে সেই গুলিবর্ষণ হতো না।


আশুলিয়ায় ছ’জনকে পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনাও এই মামলার অন্তর্ভুক্ত। রায়ে বলা হয়েছে, এই হামলা সংগঠনের নির্দেশও হাসিনাই দেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
ট্রাইবুনালের বিচারপতিরা বলেন, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার তীব্র ইচ্ছা থেকেই হাসিনা ছাত্র-যুবদের দাবি উপেক্ষা করেন ও আন্দোলন দমনকে অগ্রাধিকার দেন। তাঁকে ‘অবহেলা, নির্দয়তা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের’ জন্য দায়ী করা হয়। তাঁর একাধিক ফোনালাপ আদালতে উপস্থাপন করা হয় এবং ভিডিও যাচাই করে দেখা হয়। কোনওটিই কৃত্রিম নয় বলে প্রমাণিত হয়েছে।

আদালত আরও উল্লেখ করে, আন্দোলনকারীদের বারবার ‘রাজাকার’ বলে অপমান করেছেন হাসিনা। এই মন্তব্য পরিস্থিতিকে অগ্নিগর্ভ করে তোলে। উস্কানিমূলক মন্তব্যের জন্য তাঁকে আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, আর বাকি দুটি ধারায় মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে প্রাক্তন পুলিশকর্তা চৌধুরী আবদুল্লা আল-মামুন রাজসাক্ষী হওয়ায় তুলনামূলক কম শাস্তি পেয়েছেন। তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং তিনিও ফাঁসির সাজা পেয়েছেন। দু’জনের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর পর কী?
বাংলাদেশ সরকারের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, রায়ের নথি ভারত সরকারের কাছে পাঠানো হতে পারে। পলাতক অবস্থায় আপিলের সুযোগ নেই, তাই আত্মসমর্পণ না করলে রায় কার্যকর হবে। ঢাকা জানিয়েছে, হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানো হবে।
জুলাই গণহত্যা মামলার পর এই রায় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও মানবাধিকার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। আন্তর্জাতিক মহলেও রায়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে।








