ভারত-কাতার সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া কাতারের প্রাক্তন আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি আর নেই। রবিবার ৭৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই শোক প্রকাশ করেছে ভারত সরকার। সোমবার তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও তাঁকে ভারতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্মরণ করেছেন।
কেন্দ্র সরকারের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, জাতীয় শোকের দিন দেশের সমস্ত সরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। পাশাপাশি সরকারি স্তরে কোনও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে না। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কাতারের জনগণ ও রাজপরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক মাধ্যমে শোকবার্তা দিয়ে বলেন, শেখ হামাদ এমন এক নেতা ছিলেন, যাঁর নেতৃত্বে কাতার উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন দিগন্তে পৌঁছেছিল। তিনি ভারতের সঙ্গে কাতারের সম্পর্ককেও নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন। জানা গিয়েছে, ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদীয় ও সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু শীঘ্রই কাতার সফরে গিয়ে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমবেদনা জানাবেন।
আধুনিক কাতারের রূপকার হিসেবে পরিচিত শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি দোহায় জন্মগ্রহণ করেন। ব্রিটেনের রয়্যাল মিলিটারি অ্যাকাডেমি স্যান্ডহার্স্টে সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তিনি কাতারের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭৭ সালে যুবরাজ ঘোষিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে দেশের নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন।
তাঁর শাসনামলেই কাতারের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) রপ্তানিকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। বিশ্বব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর আমলে কাতারের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২০ গুণ বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতির আকার পৌঁছে যায় প্রায় ১৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
ভারত-কাতার কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও শেখ হামাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মতো একাধিক ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তাঁর সময়েই ভারত কাতারের অন্যতম বৃহত্তম এলএনজি আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়। একই সঙ্গে কাতারে কর্মরত ভারতীয় প্রবাসীদের সংখ্যাও দ্রুত বাড়তে থাকে।
শাসনকালে তিন বার—১৯৯৯, ২০০৫ এবং ২০১২ সালে—ভারত সফর করেন শেখ হামাদ। প্রতিটি সফরেই জ্বালানি, শিক্ষা, পরিকাঠামো, বিনিয়োগ-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দীর্ঘ ১৮ বছর দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার পর ২০১৩ সালে তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
শেখ হামাদের প্রয়াণ শুধু কাতারের জন্য নয়, ভারত-কাতার সম্পর্কের ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা কৌশলগত অংশীদারিত্ব আজও দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম শক্ত ভিত হিসেবে বিবেচিত হয়।



