আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত মিলছে। তালিবান শাসিত আফগানিস্তান এবং রাশিয়ার মধ্যে সামরিক সহযোগিতা সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ঘিরে কূটনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই সমঝোতা শুধু মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই প্রভাবিত করবে না, পাকিস্তানের কৌশলগত হিসাবও বদলে দিতে পারে।
গত ২৭ মে মস্কোয় আয়োজিত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ফোরামে আফগানিস্তানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মহম্মদ ইয়াকুব এবং রুশ প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যদিও চুক্তির বিস্তারিত বিষয়বস্তু প্রকাশ্যে আনা হয়নি, তবুও দুই পক্ষের ঘনিষ্ঠতা আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে।
২০২১ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর তালিবান সরকারকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে রাশিয়া-র সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা কাবুলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত বছর রাশিয়া তালিবান প্রশাসনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ আরও বাড়ায়, যা বর্তমানে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতি, সীমান্ত উত্তেজনা এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে দ্বন্দ্ব ক্রমশ বেড়েছে। ইসলামাবাদ অভিযোগ করে আসছে যে আফগান ভূখণ্ডে অবস্থান করে পাকিস্তানবিরোধী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলি সক্রিয় রয়েছে। যদিও কাবুল সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
একইসঙ্গে রাশিয়ারও নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। মধ্য এশিয়ায় জঙ্গিবাদ, বিশেষ করে আইএসআইএস-খোরাসানের কার্যকলাপ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন মস্কো। ফলে আফগানিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চাইছে ক্রেমলিন।
কিছু পশ্চিমি বিশ্লেষক মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই সহযোগিতার ফলে আফগানিস্তান আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম বা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির সুবিধা পেতে পারে। তবে কাবুল সরাসরি যোদ্ধা পাঠাবে বা ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে— এমন দাবির পক্ষে এখনও কোনও সরকারি প্রমাণ সামনে আসেনি।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের উদ্বেগ বাড়তে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ আফগানিস্তানের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদ বিষয়টিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।
তবে এখনও পর্যন্ত রাশিয়া বা তালিবান প্রশাসন কেউই চুক্তির নির্দিষ্ট শর্ত প্রকাশ করেনি। ফলে এই সমঝোতা কতটা প্রতীকী আর কতটা বাস্তব সামরিক সহযোগিতায় রূপ নেবে, তা সময়ই বলবে। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট, মস্কো-কাবুল ঘনিষ্ঠতা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।



