মহাশূন্যে এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। নিজের ছায়াপথের কেন্দ্র ছেড়ে সেকেন্ডে প্রায় ৯৫৪ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছে এক অতিকায় কৃষ্ণগহ্বর। নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপে ধরা পড়া এই বিরল ঘটনাটি নতুন করে আলোড়ন ফেলেছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের জগতে।
বিজ্ঞানীরা এই দুরন্ত গতিসম্পন্ন কৃষ্ণগহ্বরের নাম দিয়েছেন আরবিএইচ–১ (RBH-1)। এর ভর আমাদের সূর্যের তুলনায় প্রায় এক কোটি গুণ বেশি—অর্থাৎ তাত্ত্বিক ভাবে এক কোটি সূর্যকে গ্রাস করার ক্ষমতা রয়েছে এই কৃষ্ণগহ্বরের।
কী ভাবে ধরা পড়ল এই ধাবমান কৃষ্ণগহ্বর
প্রথমবার ২০২৩ সালে আরবিএইচ–১-এর অস্তিত্বের ইঙ্গিত মিলেছিল। তখনই বিজ্ঞানীদের সন্দেহ হয়েছিল, বস্তুটি অস্বাভাবিক গতিতে এগোচ্ছে। তবে নিশ্চিত প্রমাণ তখন হাতে ছিল না।
এরপর থেকে আমেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল জ্যোতির্পদার্থবিদ, নাসার জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের তথ্য ব্যবহার করে কৃষ্ণগহ্বরটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেই নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে— আরবিএইচ–১ সত্যিই নিজের ছায়াপথ থেকে বেরিয়ে এসে ছুটে চলেছে। এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার ভ্যান ডোক্কাম।
কোন দিকে এগোচ্ছে আরবিএইচ–১
বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী,
-
কৃষ্ণগহ্বরটি তার জন্মছায়াপথের প্রান্ত ছুঁয়ে এগোচ্ছে
-
গন্তব্য: আন্তঃছায়াপথ শূন্যস্থান (Intergalactic Space)
-
পিছনে রেখে যাচ্ছে প্রায় দু’লক্ষ আলোকবর্ষ বিস্তৃত নক্ষত্রের কাঠামো
এই গতি আলোর বেগের প্রায় ০.৩২ শতাংশ—যা এত বিপুল ভরের বস্তুর ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিরল।

গতি নয়, রহস্য লুকিয়ে আছে অন্যত্র
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মহাকাশে ৯৫৪ কিমি/সেকেন্ড বেগ খুব একটা বিরল নয়। আরও বেশি গতির বস্তুর নজির রয়েছে।
👉 আসল রহস্য হল—এত ভারী কৃষ্ণগহ্বর কীভাবে নিজের ছায়াপথ থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গবেষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ।
সম্ভাব্য কারণ: মহাকর্ষীয় ‘রিকয়েল’
প্রাথমিক ভাবে বিজ্ঞানীদের অনুমান—
-
একাধিক সুপারম্যাসিভ কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ ও একত্রীভবনের সময়
-
যে ভয়াবহ মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ও শক্তির প্রতিক্রিয়া (Gravitational Recoil) তৈরি হয়
-
সেই ধাক্কাতেই আরবিএইচ–১ তার ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে ছিটকে বেরিয়ে গেছে
এই তত্ত্ব বহুদিন ধরেই আলোচনায় ছিল, তবে এটাই প্রথম সরাসরি পর্যবেক্ষণ, যেখানে একটি ধাবমান সুপারম্যাসিভ কৃষ্ণগহ্বরের স্পষ্ট প্রমাণ মিলল।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার
জ্যোতির্বিজ্ঞানে এতদিন ধরে ধারণা ছিল—
-
ছায়াপথের কেন্দ্রে কৃষ্ণগহ্বর স্থির থাকে
-
তার চারপাশেই ছায়াপথের বিবর্তন ঘটে
কিন্তু আরবিএইচ–১ দেখাচ্ছে, প্রয়োজনে কৃষ্ণগহ্বরও ভবঘুরে হয়ে উঠতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, মহাশূন্যে এমন আরও বহু ‘অদৃশ্য যাযাবর কৃষ্ণগহ্বর’ থাকতে পারে, যাদের অস্তিত্ব এখনও ধরা পড়েনি। আগামী দিনে আরও উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি দিয়ে সেগুলির খোঁজ পাওয়া সম্ভব বলেই আশাবাদী বিজ্ঞানীরা।



