চার দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিলেন রাজ্যের প্রাক্তন পরিবহনমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী। বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনেকটাই নীরব ছিলেন। এবার প্রকাশ্যে জানালেন, মানুষের রায় মেনে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বেরও প্রশংসা শোনা গেল তাঁর মুখে।
মাধ্যমিক পরীক্ষার পর রাজনৈতিক মঞ্চে প্রথম বক্তৃতা দিয়েছিলেন স্নেহাশিস। এরপর তিন বার বিধায়ক নির্বাচিত হওয়া থেকে মন্ত্রিত্ব— রাজনীতির দীর্ঘ অধ্যায় পার করেছেন তিনি। তবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন প্রাক্তন এই নেতা।


স্নেহাশিস চক্রবর্তীর কথায়, জনগণ যখন তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন সক্রিয় রাজনীতিতে থাকার প্রয়োজনীয়তা তিনি আর দেখছেন না। তাঁর মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে সৌজন্য, মূল্যবোধ এবং সুস্থ বিতর্কের জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে। অসৌজন্যতা, কুৎসা এবং অপপ্রচারের রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নির্বাচনী ফলাফল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহু কাজ করলেও ভোটাররা নতুন বিকল্পের দিকে ঝুঁকেছেন। গণতন্ত্রে হার-জিত স্বাভাবিক বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে রাজনীতি থেকে দূরে গেলেও জনজীবন বা রাজনৈতিক আলোচনা থেকে পুরোপুরি সরে যেতে চান না স্নেহাশিস। তিনি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে লেখালেখি বা মতামতের মাধ্যমে জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান, কিন্তু কোনও রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য হিসেবে নয়।


তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও মুখ খুলেছেন তিনি। তাঁর মতে, দলের জনপ্রতিনিধিদের নিজস্ব মত প্রকাশের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকলে হয়তো বর্তমান বিভাজনের পরিস্থিতি তৈরি হত না। যদিও দলীয় সংকটের মাঝেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব নিয়ে কোনও প্রশ্ন তোলেননি তিনি।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণভাবে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-র প্রশংসাও করেছেন স্নেহাশিস। তাঁর বক্তব্য, শুভেন্দু একজন অভিজ্ঞ ও লড়াকু রাজনৈতিক নেতা, যিনি দীর্ঘদিন জনসংযোগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বাংলার মানুষ তাঁর উপর আস্থা রেখেই দায়িত্ব দিয়েছে বলে মনে করেন প্রাক্তন মন্ত্রী।
বিশেষ করে প্রশাসনিক বৈঠকে বিরোধী দলের বিধায়কদের আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। স্নেহাশিসের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী মতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে অতীতে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও রাজনৈতিক চাপের অভিযোগের প্রসঙ্গও টেনে আনেন তিনি। নতুন সরকারের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, অতীতের ভুল যেন পুনরাবৃত্তি না হয় এবং রাজনৈতিক হিংসা বন্ধ করে সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তোলা হোক।
৪০ বছরের রাজনৈতিক জীবনের ইতি টানার সিদ্ধান্তের মধ্যেও তাই স্নেহাশিস চক্রবর্তীর বক্তব্যে উঠে এসেছে আত্মসমালোচনা, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে এক ধরনের আশাবাদ।
সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে
Google News এবং Google Discover-এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।



