ডলারের চাপে টালমাটাল টাকা, চিনের কৌশলে রুপিকে বাঁচাতে RBI-এর নতুন অস্ত্র কী?

ডলারের তুলনায় রুপির দর ৯৭ টাকার কাছে পৌঁছনোর মুখে ফরেক্স বাজারে নতুন বিধি আনল RBI। ঝুঁকি সংরক্ষণ, ডেরিভেটিভ লেনদেনের সীমা কমানো এবং তেল সংস্থাকে সরাসরি ডলার দেওয়ার মাধ্যমে চাপ কমানোর চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ডলারের তুলনায় ভারতীয় মুদ্রার দর প্রায় ৯৭ টাকার দিকে এগোতেই রুপিকে সামলাতে নতুন পদক্ষেপ করল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (Reserve Bank of India বা RBI)। শনিবার, ১০ অক্টোবর, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে জল্পনামূলক লেনদেন নিয়ন্ত্রণে একগুচ্ছ বিধি ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বড় অঙ্কের ফরেক্স ডেরিভেটিভ লেনদেনে ঝুঁকি সংরক্ষণের নতুন ব্যবস্থা এবং প্রকৃত লেনদেনের প্রমাণ ছাড়া করা যায় এমন চুক্তির সীমা কমানো। চিনের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের ব্যবহৃত নিয়ন্ত্রণমূলক কৌশলের সঙ্গে এই পদক্ষেপের মিল রয়েছে।

শুধু বাজারে ডলার বিক্রি করে বা সুদের হার বাড়িয়ে রুপিকে সামলানোর বদলে এ বার বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের নিয়ম আরও কড়া করছে RBI। এর লক্ষ্য, ডলারের ভবিষ্যৎ দর নিয়ে অতিরিক্ত জল্পনা কমানো এবং আমদানি-রফতানির সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলির মুদ্রা-ঝুঁকি সামলানোর পদ্ধতিতে শৃঙ্খলা আনা। তবে এই পদক্ষেপে রুপির দর স্থায়ীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

রুপির উপর চাপ বাড়ার পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি ভারতের আমদানি খরচ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাহার এবং ডলারের চাহিদা বৃদ্ধিও ভারতীয় মুদ্রার উপর চাপ তৈরি করছে। ৯ অক্টোবর লেনদেনের শেষে ডলারের তুলনায় রুপির দর ছিল ৯৬.৭৩; মুদ্রাটি মে মাসে নথিভুক্ত ৯৬.৯৬-এর সর্বনিম্ন স্তরের কাছাকাছি রয়েছে।

নতুন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ফরেন এক্সচেঞ্জ রিস্ক রিজার্ভ (Foreign Exchange Risk Reserve বা FERR)। ২ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের নির্দিষ্ট ফরেক্স ডেরিভেটিভ চুক্তির ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কগুলিকে ২০ শতাংশ ঝুঁকি-সংরক্ষণ রাখতে হবে। এর ফলে বড় অঙ্কের মুদ্রা-লেনদেনে ব্যাঙ্কের খরচ বাড়তে পারে এবং অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।

আরও একটি পরিবর্তন এসেছে প্রকৃত আর্থিক লেনদেনের ভিত্তি বা underlying exposure ছাড়া ফরেক্স ডেরিভেটিভ চুক্তির ক্ষেত্রে। আগে এই ধরনের লেনদেনের সীমা ছিল ১০০ মিলিয়ন ডলার; RBI তা কমিয়ে ৫ মিলিয়ন ডলার করেছে। পাশাপাশি বাতিল করা ফরেক্স চুক্তি ফের বুক করার নিয়মও কড়া করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য, প্রকৃত আমদানি-রফতানি বা আর্থিক প্রয়োজনের বাইরে মুদ্রার দরের ওঠানামা থেকে লাভ করার সুযোগ সীমিত করা।

রুপির বাজারে ডলারের চাহিদা কমাতে তেল সংস্থাগুলির জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে RBI। সোমবার থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ইন্ডিয়ান অয়েল (Indian Oil), হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম (Hindustan Petroleum) এবং ভারত পেট্রোলিয়াম (Bharat Petroleum)-কে সরাসরি ডলার সরবরাহের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা চালু করার কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। এর ফলে এই সংস্থাগুলির ডলার কেনার চাহিদার একটি অংশ খোলা বাজার থেকে সরে যাবে। তবে সরাসরি ডলার সরবরাহ করলে বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারের উপর চাপ পড়তে পারে।

চিনের কৌশলের সঙ্গে RBI-এর পদক্ষেপের মিল কোথায়? চিন দীর্ঘদিন ধরেই শুধু সুদের হার বা বাজারে মুদ্রা কেনাবেচার উপর নির্ভর না করে প্রশাসনিক বিধি, ব্যাঙ্কিং নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনে বিধিনিষেধের মাধ্যমে নিজেদের মুদ্রার বাজার পরিচালনা করে। ভারতের নতুন ব্যবস্থাতেও বাজারে অংশগ্রহণকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার খরচ বাড়ানো এবং ডেরিভেটিভ লেনদেনের উপর নজরদারি জোরদার করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে দুই দেশের অর্থনীতি, মুদ্রা পরিচালনার কাঠামো এবং নিয়ন্ত্রণের পরিসর এক নয়।

এই পদক্ষেপের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়তে পারে। রুপির দর দীর্ঘদিন দুর্বল থাকলে বিদেশ থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেল, ইলেকট্রনিক্স, যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য পণ্যের খরচ বাড়তে পারে। তার প্রভাব পরিবহণ, উৎপাদন ও পণ্যের দামে পড়ার আশঙ্কা থাকে। বিদেশে পড়াশোনা, ভ্রমণ বা ডলারে অর্থ পাঠানোর খরচও বাড়তে পারে। তবে এই প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক তেলের দাম, ডলারের গতিবিধি এবং RBI-এর পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয় তার উপর।

রুপিকে স্থিতিশীল রাখার লড়াই তাই এখন একাধিক ফ্রন্টে। সুদের হার বাড়ানো, বাজারে ডলার বিক্রি, বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার ব্যবহার এবং ফরেক্স লেনদেনে কড়াকড়ি—সব কৌশলই কাজে লাগাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। নতুন বিধিগুলি বাজারের অস্থিরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি প্রতিকূল থাকলে শুধু নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপে রুপির চাপ পুরোপুরি কাটবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন