চাল বা গমের লাইনে দাঁড়ানো রেশন ব্যবস্থায় বড়সড় বদলের ইঙ্গিত। কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন পরিকল্পনা কার্যকর হলে, আগামী দিনে রেশন কার্ডধারীরা আর বাধ্যতামূলকভাবে খাদ্যশস্য নাও পেতে পারেন—তার বদলে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারে ভর্তুকির টাকা। অর্থাৎ রেশন নেবেন, না নগদ টাকা নেবেন—সে সিদ্ধান্ত থাকবে উপভোক্তার হাতেই। এই সম্ভাব্য পরিবর্তন দেশের খাদ্য সুরক্ষা ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক মোড় আনতে পারে।
ভারতের রেশন ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (DBT) মডেল। সরকারের ভাবনায়, খাদ্যশস্যের পরিবর্তে ভর্তুকির অর্থ সরাসরি পৌঁছে দিলে খরচ কমবে, দুর্নীতি রোখা যাবে এবং উপভোক্তারা আরও বেশি স্বাধীনতা পাবেন।


ই-রুপি (e-RUPI): ডিজিটাল ভাউচারে রেশন
এই নতুন ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হল ই-রুপি—এক ধরনের ডিজিটাল ভাউচার। সরকারের এই উদ্যোগে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা করছে স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া।
ব্যবস্থাটি কীভাবে কাজ করবে, সংক্ষেপে দেখুন—
-
মোবাইলে ভাউচার: প্রতি মাসে রেশন কার্ডধারীর রেজিস্টার্ড মোবাইলে নির্দিষ্ট অঙ্কের ই-রুপি ভাউচার পাঠানো হবে।
-
পরিবারভিত্তিক অঙ্ক: পরিবারের সদস্য সংখ্যার উপর নির্ভর করে টাকার পরিমাণ ধার্য হবে (ধরা যাক ৫০০ বা ১০০০ টাকা)।
-
দুটি বিকল্প: ভাউচার নিয়ে রেশন দোকান থেকে খাদ্যশস্য নেওয়া যাবে। আবার চাইলে সেই ভাউচার রিডিম করে সমপরিমাণ নগদ টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে নেওয়ার সুযোগও থাকবে।
কেন এই পথে হাঁটছে কেন্দ্র?
সরকারি মহলে জানা যাচ্ছে, মূলত তিনটি বড় কারণে এই বদলের কথা ভাবা হচ্ছে—
১. বিপুল খরচের চাপ
২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগামী পাঁচ বছর বিনামূল্যে রেশনের ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু হিসাব বলছে, এই প্রকল্পে সরকারের খরচ প্রায় ১১ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ব্যয় সামলাতেই বিকল্প মডেলের সন্ধান।
২. ভুয়ো রেশন কার্ড ছাঁটাই
খাদ্যমন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে হাজার হাজার ডুপ্লিকেট বা অযোগ্য রেশন কার্ড রয়েছে। ইতিমধ্যেই ৭৬ হাজারের বেশি কার্ড চিহ্নিত হয়েছে। আয়কর, জিএসটি ও বাহন পোর্টালের তথ্য মিলিয়ে এই যাচাই চলছে, যার বড় অংশ সামনে এসেছে উত্তরপ্রদেশে।
৩. দুর্নীতি ও চুরি বন্ধ
নগদ টাকা বা ডিজিটাল ভাউচার সরাসরি পৌঁছলে মাঝখানের দালালচক্র, কম ওজনে রেশন দেওয়া বা কালোবাজারির সুযোগ কার্যত বন্ধ হবে—এটাই সরকারের দাবি।
এখন কোথায় চালু এই ব্যবস্থা?
এই মুহূর্তে সারা দেশে নয়। ধাপে ধাপে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে চণ্ডীগড়, পুদুচেরি, দাদরা ও নগর হাভেলি এবং মহারাষ্ট্রের কয়েকটি এলাকায়। সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সব জায়গায় ইতিমধ্যেই ১১৩ কোটি টাকার বেশি সরাসরি উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে।
সমর্থন ও আপত্তি—দুটোই
সরকারের দাবি, পাইলট প্রকল্প সফল হলে ভবিষ্যতে সারা দেশেই এই মডেল চালু করা হবে। তবে আপত্তিও কম নয়। অল ইন্ডিয়া ফেয়ার প্রাইস শপ ডিলার ফেডারেশন-এর মতে, এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে বহু রেশন ডিলার কর্মহীন হয়ে পড়বেন। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বম্বর বসুর আশঙ্কা—নগদ টাকা পেলে অনেকেই তা পুষ্টিকর খাবারের বদলে অন্য খাতে খরচ করতে পারেন, যা খাদ্য সুরক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে আঘাত করবে।
সব মিলিয়ে, বিষয়টি এখনও নীতিগত বিবেচনার স্তরে। দেশজুড়ে চালুর আগে এর সুবিধা-অসুবিধা খতিয়ে দেখে বিস্তারিত নোট তৈরির কাজ চলছে সরকারের অন্দরমহলে।










