রথযাত্রা হিন্দু ধর্মের অন্যতম পবিত্র উৎসব। এই দিন ভগবান জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা রথে চড়ে শ্রীমন্দির থেকে গুন্ডিচা মন্দিরে যাত্রা করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, রথযাত্রার দিনে ভক্তিভরে পুজো, দান, জপ ও রথদর্শন করলে জীবনে সুখ, শান্তি ও সৌভাগ্য লাভ হয়।
তবে শুধু পুজো করলেই নয়, শাস্ত্রে এই দিন কিছু বিশেষ কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি কাজ এড়িয়ে চলার কথাও বলা হয়েছে। অনেকেই প্রতি বছর জানতে চান—রথযাত্রার দিন কী করবেন? কী করবেন না? এই প্রতিবেদনে রইল সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা।
রথযাত্রার দিন কী করবেন?
১. সকালে স্নান করে পরিষ্কার পোশাক পরুন
রথযাত্রার দিন ভোরে উঠে স্নান করে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা শুভ বলে মনে করা হয়। অনেকেই এই দিন হলুদ, সাদা বা গেরুয়া রঙের পোশাক পরেন।
পরিচ্ছন্নতা শরীর ও মনের পবিত্রতার প্রতীক। তাই পুজোর আগে নিজেকে শুদ্ধ রাখা ধর্মীয় আচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২. ভগবান জগন্নাথের পূজা করুন
বাড়িতে জগন্নাথদেবের ছবি বা বিগ্রহ থাকলে ফুল, তুলসী পাতা, চন্দন, ধূপ ও প্রদীপ দিয়ে পুজো করতে পারেন।
পুজোর সময় ভক্তিভরে নামজপ বা স্তোত্র পাঠ করলে মন শান্ত হয় এবং ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি আরও দৃঢ় হয়।
৩. রথদর্শন করুন
শাস্ত্রে বলা হয়, রথযাত্রার দিনে ভগবানকে রথে দর্শন করা অত্যন্ত শুভ।
যাঁদের পক্ষে সম্ভব, তাঁরা স্থানীয় রথযাত্রায় অংশ নিতে পারেন। আর যদি বাইরে যাওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে ঘরে বসেই অনলাইনে বা টেলিভিশনে রথযাত্রার সরাসরি সম্প্রচার দেখে ভক্তিভরে প্রার্থনা করতে পারেন।
৪. রথের দড়ি টানুন (সুযোগ থাকলে)
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ভক্তিভরে রথের দড়ি টানলে পুণ্য লাভ হয়।
তবে শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে এই কাজে অংশ নেওয়াই শ্রেয়। ভিড়ের মধ্যে নিরাপত্তার দিকেও অবশ্যই নজর রাখতে হবে।
৫. মহাপ্রসাদ গ্রহণ করুন
রথযাত্রার দিনে জগন্নাথদেবের ভোগ বা মহাপ্রসাদ গ্রহণ অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়।
মহাপ্রসাদকে শুধু খাবার নয়, ঈশ্বরের আশীর্বাদ হিসেবেও দেখা হয়।
৬. দান-পুণ্য করুন
এই দিনে দরিদ্র মানুষকে অন্ন, বস্ত্র বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী দান করলে শুভ ফল লাভ হয় বলে ধর্মীয় বিশ্বাস।
গরুকে খাদ্য দেওয়া, পাখিদের জন্য জল রাখা কিংবা অভাবী মানুষকে আহার করানোও পুণ্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত।
৭. নামজপ ও ধর্মগ্রন্থ পাঠ করুন
রথযাত্রার দিন ভগবান বিষ্ণু, শ্রীকৃষ্ণ বা জগন্নাথদেবের নামজপ করা অত্যন্ত শুভ।
অনেক ভক্ত এই দিন ভগবদ্গীতা, শ্রীমদ্ভাগবত বা জগন্নাথ সম্পর্কিত স্তোত্র পাঠ করেন।
রথযাত্রার দিন কী করবেন না?
১. অশান্তি বা ঝগড়া এড়িয়ে চলুন
ধর্মীয় উৎসবের দিনে রাগ, হিংসা, অশান্তি বা কটু কথা বলা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এই দিন মন শান্ত রাখা এবং সকলের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখাই শ্রেয়।
২. অহংকার ও অন্যের অপমান করবেন না
রথযাত্রার মূল শিক্ষা হল বিনয় ও সমতা।
তাই কাউকে অপমান করা, অহংকার করা বা অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া উচিত নয়।
৩. নেশাজাতীয় দ্রব্য থেকে দূরে থাকুন
ধর্মীয় আচার পালনের দিনে মদ্যপান, নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ বা অনৈতিক আচরণ শাস্ত্রে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
৪. নিরামিষ আহার করার চেষ্টা করুন
অনেক ভক্ত রথযাত্রার দিন নিরামিষ খাবার গ্রহণ করেন এবং সাত্ত্বিক আহারকে গুরুত্ব দেন।
যদিও সব সম্প্রদায়ের নিয়ম এক নয়, তবু ভক্তিভরে সাত্ত্বিক জীবনযাপনকে এই দিনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৫. খাদ্য অপচয় করবেন না
মহাপ্রসাদ বা ভোগকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করা হয়।
তাই খাবার নষ্ট না করা এবং যতটা প্রয়োজন ততটাই গ্রহণ করা উচিত।
৬. ভক্তদের অসুবিধা সৃষ্টি করবেন না
রথযাত্রার সময় প্রচুর মানুষের সমাগম হয়।
লাইন ভাঙা, ধাক্কাধাক্কি করা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকা উচিত। প্রবীণ, শিশু ও মহিলাদের সুবিধার বিষয়েও সচেতন থাকা প্রয়োজন।
৭. অশুচি অবস্থায় পূজা করবেন না
পূজার আগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং যথাসম্ভব শুদ্ধভাবে উপাসনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
রথযাত্রার মূল শিক্ষা
রথযাত্রা আমাদের শেখায়—
- ঈশ্বর সকলের জন্য সমান।
- বিনয় ও ভক্তিই প্রকৃত ধর্ম।
- দান, সেবা ও মানবিকতা জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ।
- অহংকার ত্যাগ করে সত্য ও ধর্মের পথে চলাই মানুষের কর্তব্য।
এই মূল্যবোধই রথযাত্রাকে শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং মানবিকতার উৎসবে পরিণত করেছে।
রথযাত্রার দিন শুধু পুজো নয়, নিজের চিন্তা, আচরণ এবং জীবনযাপনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনার বার্তা দেয়। ভক্তিভরে ঈশ্বরের স্মরণ, সৎকর্ম, দান-পুণ্য এবং শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনই এই উৎসবের প্রকৃত উদ্দেশ্য। শাস্ত্রে বর্ণিত পালনীয় নিয়ম মেনে রথযাত্রা উদযাপন করলে মানসিক শান্তি ও আধ্যাত্মিক তৃপ্তি লাভ হয় বলে ভক্তদের বিশ্বাস।






