২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) পরাজয়ের পর দলের অন্দরের ভাঙন আরও প্রকাশ্যে এসেছে। এর মধ্যেই তৃণমূলের সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় (Rachana Banerjee)-এর শিবির বদল নিয়ে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক। কেন হঠাৎ বিজেপির দিকে ঝুঁকলেন? তৃণমূল ক্ষমতায় ফিরলে কি দলেই থাকতেন? শুক্রবার হুগলির এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে একাধিক প্রশ্নের জবাব দিলেন ‘দিদি নম্বর ওয়ান’।
রচনা স্পষ্ট করে জানান, তাঁর এখনও সাংসদ হিসেবে প্রায় তিন বছর মেয়াদ বাকি। সেই সময়টুকু মানুষের জন্য কাজ করতেই চান তিনি। তাঁর দাবি, দলীয় পরিচয়ের চেয়ে এলাকার উন্নয়ন এবং মানুষের কাজ তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তৃণমূল ছেড়ে কেন বিজেপির সঙ্গে গেলেন, সেই প্রশ্নের জবাবে রচনা বলেন, তিনি তৃণমূল, বিজেপি বা সিপিএম—কোনও দলের রাজনীতি বুঝতে চান না। সাংসদ হিসেবে মানুষের জন্য কাজ করাই তাঁর মূল লক্ষ্য। বিজেপির বিধায়কদের সঙ্গে সমন্বয় করেও সেই কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে চান বলে জানান তিনি।
তবে রচনার দলবদলের অন্যতম বড় প্রশ্ন ছিল, তৃণমূল যদি ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে জিতত, তাহলে কি তিনি দলেই থাকতেন? এই প্রশ্নের উত্তরে রচনার জবাব, তৃণমূল জিতলে তিনি তৃণমূলেই থাকতেন।
রচনা বলেন, তৃণমূল সরকার থাকাকালীন তিনি নিজের এলাকার জন্য যে কাজ করতে চেয়েছিলেন, তার অনেকটাই করতে পারেননি। তাঁর দাবি, রাজ্যের আর্থিক সমস্যার কথা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)-ও বলতেন। সেই জায়গা থেকেই রাজ্যে কেন্দ্র ও রাজ্যে একই রাজনৈতিক জোটের সরকার থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেছিলেন তিনি।
‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের পক্ষে সওয়াল করে রচনা জানান, রাজ্যের উন্নয়নের স্বার্থেই কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। তাঁর দাবি, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই বেশ কিছু ক্ষেত্রে ভালো কাজ শুরু করেছে।
নির্বাচনের আগে ও পরে তৃণমূলের অন্দরের দুর্নীতি নিয়েও সরব হতে দেখা গিয়েছিল রচনাকে। দলের একাধিক নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। সেই সময় তাঁর বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট চর্চা হয়েছিল।
তবে শুক্রবার রচনা নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মূলত কাজের প্রসঙ্গেই জোর দেন। তাঁর কথায়, সাংসদ হিসেবে এখনও অনেক কাজ বাকি। দল বদলের সিদ্ধান্তের পিছনে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের চেয়ে এলাকার উন্নয়নকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন বলে বোঝাতে চেয়েছেন তিনি।
এ দিন তাঁর বহুলচর্চিত ‘আরবানা’ মন্তব্য নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। কলকাতার ইএম বাইপাস সংলগ্ন বিলাসবহুল আবাসন আরবানা (Urbana)-য় থাকতে গেলে ‘যোগ্যতা’ লাগে—রচনার এই মন্তব্য নিয়ে সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
এ বার সেই মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রচনা জানান, একসময় তিনি ছোট একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন এবং আরবানায় থাকার স্বপ্ন দেখতেন। বিশেষ করে মা-বাবাকে সেখানে রাখার ইচ্ছা ছিল তাঁর। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে বলেই আবাসনটি নিয়ে ওই মন্তব্য করেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
রচনার কথায়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নেই—এমনটা ভাবার কারণ নেই। তিনি নিজেও গড়িয়াহাট থেকে জামাকাপড় কেনেন এবং তাঁর মা এখনও গড়িয়ায় থাকেন বলে জানান। তবে সমাজমাধ্যমে মন্তব্যটি নিয়ে যে বিতর্ক হয়েছে, তা দেখে এখন তাঁর মনে হচ্ছে, ওই কথা না বললেই ভালো হত।
দলবদল থেকে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার, আরবানা মন্তব্য—একাধিক বিতর্কিত বিষয় নিয়ে এ দিন নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করলেন হুগলির সাংসদ। আপাতত তাঁর দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে সাংসদ হিসেবে মানুষের জন্য কাজ করাই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনে বিজেপি শিবিরে থেকে সেই কাজ কতটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন, এখন সেটাই দেখার।



