প্রশ্নের মুখে নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০, আন্দোলনে নামল PSU

প্রশ্নের মুখে নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০, আন্দোলনে নামল PSU

নজরবন্দি ব্যুরোঃ প্রশ্নের মুখে ‘নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০’ আন্দোলনে নামল PSU। কেন্দ্রীয় সরকার এই অতিমারী কালে ছাত্র স্বার্থের ‘পরিপন্থী’ “নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০” যেভাবে সংসদকে এড়িয়ে মন্ত্রীসভায় অনুমোদন করিয়েছে। তার বিরুদ্ধে আজ পিএসইউ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এই শিক্ষানীতি বাতিলের দাবীতে আন্দোলনে নামে। সমর্থকরা পোষ্টার হাতে ও নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির অনুলিপি পুড়িয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে এবং ঈদ পরবর্তী সময় এই বিক্ষোভ কর্মসূচি চলবে বলে জানিয়েছে। পিএসইউ রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ নওফেল সাফিউল্লা বলেন, এই শিক্ষানীতির মধ্য দিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বাজারের হাতে তুলে দেওয়ার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে৷ সংবিধান অনুযায়ী শিক্ষা যৌথ তালিকাভুক্ত হওয়া সত্বেও, তা অস্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ধ্বংস করে শিক্ষাকে সম্পূর্ন কেন্দ্রীয়করণ করতে চাইছে৷ পি এস ইউ মনে করে এই শিক্ষানীতি চালু করবার আগে শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা যে মতামত দিয়েছেন তা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন ছিল।বৈষম্যমুক্ত সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনে নীতি প্রণয়ন হোক।

আরও পড়ুনঃ ২০২১ নির্বাচনে হবু শিক্ষকদের মন জিততে নয়া উদ্যোগ রাজ্য সরকারের।

উল্লেখ্য, একই ইস্যুতে এদিন বিশিষ্ট শিক্ষক কিংকর অধিকারী নজরবন্দিতে একটি প্রতিবেদন লেখেন। সেই প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য ছিল, বেসরকারি শিক্ষার পরিবর্তে সম্পূর্ণরূপে উন্নত পরিকাঠামোর সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে কোনো শিক্ষানীতি সফল হতে পারেনা। তিনি মোট ১৫ টি পয়েন্ট উল্লেখ করেন। পয়েন্ট গুলি হল।

১) জাতীয় শিক্ষা নীতির মাধ্যমে শিক্ষার জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থের যোগান প্রয়োজন তা আসবে কি করে? জিডিপি ৬% করার কথা বলা হয়েছে – এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কিন্তু প্রতিবছর শিক্ষায় বরাদ্দকৃত অর্থ কমানো হচ্ছে অথচ কিভাবে জিডিপি ৬ তে নিয়ে যাওয়া হবে সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

২) শিক্ষা যুগ্ম তালিকায় রয়েছে। আলাপ-আলোচনা, সমালোচনা বা প্রতিবাদের রাস্তা বন্ধ করে, রাজ্য গুলির সাথে আলোচনা না করে, সংসদকে এড়িয়ে করোনার মতো অতিমারি ভাইরাসের আক্রমণে যখন দেশ জর্জরিত তখন এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য সময়টাকে বেছে নেওয়া হল কেন?

৩) সামগ্রিক পরিকাঠামো গড়ে না তুলে বারবার গুরুগম্ভীর শিক্ষা নীতি ঘোষণা করে কতটুকু সুফল পাওয়া যাবে? বিগত দিনে ১৯৮৬ সালের ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’ এবং ২০০৯ সালের ‘শিক্ষার অধিকার আইন’ একইভাবে বিরাট আশা নিয়ে মানুষের কাছে এসেছিলো। বাস্তবে আমরা কি পেয়েছি?

৪) শিক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্নরূপে বেসরকারিকরণের গ্রাস থেকে রক্ষা করার কোনো পরিকল্পনা এই শিক্ষা নীতির মধ্যে নেই। শিক্ষার সম্পূর্ণ দায়ভার সরকার গ্রহণ না করলে এই শিক্ষানীতি বাস্তবে সকল মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবে কি? দেশের বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে অবসান ঘটিয়ে শিক্ষার সম্পূর্ণ দায় সরকার গ্রহণ করার দিকে এগোচ্ছে কি? নাকি উল্টো পথে হাঁটা হচ্ছে?

৫) মাধ্যমিক শিক্ষার গুরুত্বকে কোনভাবেই হ্রাস করা ঠিক নয়। এই পরীক্ষার পর বহু ছাত্র-ছাত্রীই ড্রপ আউট হয়ে যায়। বর্তমান কাঠামোকে বদলে দিয়ে যদি সেমিস্টার পদ্ধতিতে নবম, দশম, একাদশ এবং দ্বাদশ শ্রেণীর ভিত্তিতে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট দেওয়া হয় তাহলে তা সম্পূর্ণ হওয়ার আগে ড্রপ আউটের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে না কি?

৬) সারাদেশে অঙ্গনওয়াড়ি শিক্ষা কেন্দ্রে তিন থেকে ছয় বছরের শিশুদের শিক্ষা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা রয়েছে। নয়া শিক্ষানীতির মাধ্যমে সেই কেন্দ্রে আরো দু বছরের জন্য অর্থাৎ প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণি যুক্ত করা হলো। এই কেন্দ্রগুলির বর্তমানে যা হাল তাতে কি আরও দুটি শ্রেণী যুক্ত করার মতো উপযুক্ত শিক্ষক এবং পরিকাঠামো রয়েছে? শিক্ষার ভিত্তি হল প্রাথমিক শিক্ষা। তা যদি নড়বড়ে হয় তাহলে বৃহৎ কথার আড়ালে ‘পর্বত মূষিক প্রসব’ করবে না তো? এর ফলে অর্থবানরা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে আরো বেশি করে দৌড়াতে বাধ্য হবে। পড়ে থাকবে অসহায় দরিদ্র সাধারণ বাড়ির সন্তানরা।

৭) নয়া শিক্ষা নীতির মাধ্যমে অনলাইন ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে ইতিমধ্যেই আমরা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে দেখতে পেয়েছি প্রায় আশি শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইনের আওতার বাইরে থেকে গিয়েছে। বিষয়টি পুরোপুরি আর্থসামাজিক অবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। এর বাস্তবায়ন কি সম্ভব? সাধারণ বাড়ির সন্তানরা এর মাধ্যমে শিক্ষার সুযোগ পাবে কি?

৮) নতুন শিক্ষানীতিতে তিনটি ভাষা শিক্ষার কথা বলা হয়েছে যার মধ্যে দুটি ভাষাকে হতে হবে ভারতীয়। তার মানে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার গুরুত্বকে হ্রাস করার চেষ্টা রয়েছে এই নীতিতে।
মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের পাশাপাশি ইংরেজি ভাষাকে প্রথম থেকে গুরুত্ব সহকারে পড়াতে হবে। তা না হলে কোনো শিক্ষার্থীর শক্ত ভিত গড়ে উঠতে পারবে না। কারণ ঐতিহাসিক কারণেই শিক্ষার সমস্ত ক্ষেত্রের জ্ঞানের আকর রয়েছে এই ভাষার মধ্যেই। তা থেকে কোনো ভাবেই বঞ্চিত করা যাবেনা ছাত্র-ছাত্রীদের। সরকারি প্রতিষ্ঠান গুলির ক্ষেত্রে এক নিয়ম আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে আরেক নিয়ম যদি হয় তাহলে পরোক্ষভাবে বেসরকারী শিক্ষার দিকে মানুষকে ঠেলে দেওয়ার এ আর এক কৌশল নয়তো?

৯) শিক্ষার ভিত্তি যদি প্রাথমিক শিক্ষা হয় তাহলে সেই শিক্ষাব্যবস্থাকে সারাদেশ জুড়ে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা এই শিক্ষা নীতিতে নেই। ভিত শক্ত হলে তবেই তো তার উপর ইমারত গড়ে তোলা সম্ভব।

১০) তিন বছর বয়স থেকে শিশু শিক্ষার বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই সময় থেকে সরকারিভাবে সারা দেশজুড়ে শিক্ষার ব্যাপক পরিকাঠামো তৈরি করতে না পারলে বেসরকারি শিক্ষা ব্যবসায়ীরা এই সুযোগটি নেবে। বলাবাহুল্য শিক্ষার এই প্রারম্ভিক স্তরটির যা করুন দশা তাতে শুরু থেকেই বেসরকারি শিক্ষা জাঁকিয়ে বসবে। পরিণতিতে বিরাট অংশের সাধারণ গরিব বাড়ির সন্তানরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক ভাবে বৈষম্য তৈরি হবে।

১১) বেশ কিছু অবাস্তব শিক্ষানীতি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির উপর চাপিয়ে দেওয়া হলেও বাস্তবে দেখা যায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রে তা কার্যকরী হয় না। ফলে একই দেশে দু’রকম শিক্ষা পদ্ধতি চলতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বিগত দিনে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইংরেজি বা পাশ ফেল প্রথা তুলে দেওয়া হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে তা বহাল থাকে। তার ফলে ধনী বাড়ির সন্তানরা অর্থের বিনিময়ে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আর বঞ্চিত থেকে যায় সাধারন গরিব বাড়ির বিরাট অংশের ছাত্র-ছাত্রীরা। এর অবসান নয়া শিক্ষানীতির মাধ্যমে ঘটবে কি?

১২) বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে ছাত্র-ছাত্রীদের পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সমর্থনযোগ্য কিন্তু পদার্থবিদ্যার সঙ্গে সঙ্গীত কিংবা সংস্কৃতের সঙ্গে কম্পিউটার সাইন্স বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সঙ্গে পদার্থবিদ্যা বিষয়শিক্ষাকে কতটা সাহায্য করবে তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।

১৩) সংস্কৃত ভাষার উপর অধিক গুরুত্ব আরোপের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে বলে মনে হয়না। প্রত্যেকে তার পছন্দ অনুযায়ী ভাষা শিক্ষা অর্জন করতেই পারে। তাতে বাধা দেওয়ার অধিকার কারো নেই। তার পছন্দের ভাষার সহিত ইংরেজি ভাষা শিক্ষাকে আবশ্যিক করতেই হবে। স্বয়ং বিদ্যাসাগর মশাই নিজে সংস্কৃতে দিকপাল হওয়া সত্ত্বেও ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ইংরেজি, ফিজিকস, গণিত এবং আধুনিক যুক্তিবিদ্যা পড়ানোর পক্ষে সুপারিশ করেছিলেন।

১৪) মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা তুলে দিয়ে নবম, দশম, একাদশ এবং দ্বাদশ শ্রেণীর ভিত্তিতে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হলে বর্তমানে সমস্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় গুলিকে উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় বহু বিষয়ে শিক্ষকসহ উন্নত পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আগে তা না করে হঠাৎ করে এই শিক্ষা ব্যবস্থা চাপিয়ে দিলে তা মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। এর সুযোগ নেবে বেসরকারি শিক্ষা ব্যবসায়ীরা।

১৫) যেখানে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স সম্পন্ন করে কাজের জন্য হাহাকার করে ঘুরে বেড়াচ্ছে সেখানে বিদ্যালয় স্তরে বৃত্তিমূলক শিক্ষা কতটুকু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে তা যথেষ্ট সন্দেহের। তাছাড়া বিশ্বায়নের যুগে এইসব শিক্ষার্থীরা হাতে কলমে কাজ শিখে খোলাবাজারে বৃহৎ শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কতটুকু পেরে উঠবে তা সহজে অনুমেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *