ভারতের সবচেয়ে আলোচিত নির্বাচন-কৌশলীদের একজন প্রশান্ত কিশোর রাজনীতি এখন জোরালো আলোচনার কেন্দ্রে। বিহার বিধানসভা নির্বাচনে জন সুরজের ভয়াবহ ভরাডুবির পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—পিকে কি তাঁর নিজের দেওয়া চ্যালেঞ্জের মতো রাজনীতি ছাড়তে চলেছেন? বিহারের গেরুয়া ঝড় তাঁর দলকে একেবারে মুছে দিয়েছে রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে। স্বপ্নের মতো শুরু করলেও বাস্তবে এসে ধাক্কাটা ছিল প্রবল।
এই নির্বাচনে জন সুরজ পার্টি ২৩৮টি আসনে প্রার্থী দিলেও একটি আসনও জিততে পারেনি। বেশিরভাগ আসনেই প্রার্থীরা জামানত হারিয়েছেন। বিহারের রাজনৈতিক মহলে এটি পিকে–র সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বলেই মনে করা হচ্ছে। যে মানুষটি বিজেপি, তৃণমূল, এআইডিএমকে, আপসহ বহু দলকে জয় পাইয়ে দিয়েছেন, তাঁর নিজের দলের এমন ফল স্বাভাবিকভাবেই বিস্ময় তৈরি করেছে। ফলে আলোচনার কেন্দ্রে এখন একটাই প্রশ্ন—এবার কি সত্যিই প্রশান্ত কিশোর রাজনীতি ছেড়ে দিচ্ছেন?
নির্বাচন চলাকালীন পিকে একাধিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করেছিলেন, নীতীশ কুমারের জেডিইউ নাকি ২৫টির বেশি আসন পাবে না। তাঁর কথায়, যদি জেডিইউ ২৫-এর বেশি আসন পায়, তবে তিনি রাজনীতি ছাড়বেন। কিন্তু বাস্তব ছবি বলছে, জেডিইউ একাই পেয়েছে ৮৫টি আসন—যা পিকে–র পূর্বাভাসের বহু গুণ বেশি। এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন আরও তীব্র হচ্ছে।
অন্যদিকে, তিনি নিজের দল নিয়েও সাহসী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন—জন সুরজ হয় ১০-এর নিচে আসন পাবে, না হয় সরাসরি ১৫০-এর ওপরে। শেষ পর্যন্ত ফল দাঁড়াল শূন্য। এই ব্যর্থতা থেকেই অনেকে মনে করছেন, পিকে হয়তো নিজের কথামতো রাজনৈতিক ময়দান ছাড়তে পারেন।
তবে জন সুরজ পার্টির সভাপতি উদয় সিং স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, প্রশান্ত কিশোর রাজনীতি ছাড়ছেন না। তাঁর কথায়, পিকে বিহারের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন নিয়ে কাজ চালিয়ে যাবেন। তিনি আরও বলেন, জন সুরজ কোনও দলের দয়ার ওপর নির্ভর করে রাজনীতিতে আসেনি, ফলে অন্য কারও কথায় রাজনীতি ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না। উদয় সিং বলেন, এনডিএ–র জয়ের পেছনে সরকারি প্রকল্পে নগদ বিতরণ বড় ভূমিকা পালন করেছে, যার প্রভাব ভবিষ্যতে বিহারের অর্থনীতিকে চাপে ফেলবে।
জন সুরজ নেতা আরও দাবি করেন, এই হারে দল ভেঙে পড়েনি; বরং তারা জানে কোন পথে এগোতে হবে। তাঁদের বক্তব্যে স্পষ্ট—পিকে দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্যই রাজনৈতিক ময়দানে নেমেছেন, একবারের পরাজয়ে তিনি সরে দাঁড়াবেন না।
এদিকে জন সুরজের জাতীয় মুখপাত্র পবন বর্মার বক্তব্য আরও এক ধাপ এগিয়ে। তিনি জানান, এই নির্বাচনের প্রকৃত ‘এক্স ফ্যাক্টর’ ছিলেন নীতীশ কুমার। দুই দশক ধরে মুখ্যমন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তাঁর ব্যক্তিত্ব, সততা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার উপরেই বিহারের বড় অংশের মানুষ ভরসা করেন। তাঁর মতে, নীতীশ কুমারের জনপ্রিয়তা ও ভাবমূর্তি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে জনসুরজ বা অন্য কোনও ছোট দল বাস্তবে সেই প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
তাই বিতর্কের মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে—প্রশান্ত কিশোর কি সত্যিই তাঁর বলে রাখা প্রতিশ্রুতির মতো রাজনীতি ছাড়বেন, নাকি এই হারই তাঁকে আরও আগ্রাসীভাবে রাজনৈতিক লড়াইয়ে ফেরাবে? আপাতত জন সুরজ নেতৃত্ব বলছে—পিকে কোথাও যাচ্ছেন না। তবে তাঁর পরবর্তী সিদ্ধান্তই বিহারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে।



