বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় সোমবার মুখোমুখি হচ্ছে পর্তুগাল (Portugal) ও স্পেন (Spain)। একদিকে ৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো (Cristiano Ronaldo)-র সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ অভিযান, অন্যদিকে ১৮ বছরের লামিন ইয়ামাল (Lamine Yamal)-এর উত্থানের গল্প। ডালাস (Dallas)-এ হতে চলা এই ‘আইবেরিয়ান ডার্বি’ ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের উত্তেজনা তুঙ্গে, কারণ ম্যাচটি শুধু কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নয়, দুই প্রজন্মের প্রতীকী লড়াইও বটে।
গত বছরের উয়েফা নেশনস লিগ (UEFA Nations League) ফাইনালের পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে এই ম্যাচে। সেই লড়াইয়ে টাইব্রেকারে স্পেনকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল পর্তুগাল। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ইউরোপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেন দুরন্ত ছন্দে থাকায় তাদেরই এগিয়ে রাখছেন অধিকাংশ ফুটবল বিশ্লেষক।
কীভাবে শেষ ষোলোয় পৌঁছল দুই দল?
গ্রুপ জে-তে পাঁচ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করে নকআউটে ওঠে পর্তুগাল। উজবেকিস্তানকে বড় ব্যবধানে হারালেও গণতান্ত্রিক কঙ্গো (Democratic Republic of Congo) ও কলম্বিয়ার (Colombia) বিরুদ্ধে ড্র করতে হয়। শেষ ৩২-এর ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার (Croatia) বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়েও ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় তারা।
অন্যদিকে গ্রুপ এইচ-এ সাত পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে থেকে শেষ ষোলোয় ওঠে স্পেন। সৌদি আরব (Saudi Arabia) ও উরুগুয়েকে (Uruguay) হারানোর পাশাপাশি কেপ ভার্দে (Cape Verde)-র বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্র করে তারা। এরপর শেষ ৩২-এর ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে (Austria) ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দেয় লা রোজা।
রোনাল্ডোর কি এটাই শেষ বিশ্বকাপ?
৪১ বছর বয়সেও পর্তুগাল দলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণের নাম ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো (Cristiano Ronaldo)। যদিও আগের মতো মাঠে আধিপত্য দেখা যায় না, তবুও দলের অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু এখনও তিনিই।
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই তাঁর আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। রোনাল্ডো নিজে বিষয়টি নিয়ে মুখ না খুললেও তাঁর বোন জানিয়েছেন, এই বিশ্বকাপের পর জাতীয় দল থেকে অবসর নিতে পারেন পর্তুগিজ তারকা। ফলে স্পেনের বিরুদ্ধে হার মানেই হয়তো আন্তর্জাতিক ফুটবলে এক কিংবদন্তির অধ্যায়ের সমাপ্তি।
ক্লাব ও দেশের হয়ে অসংখ্য ট্রফি জিতলেও বিশ্বকাপ এখনও তাঁর ট্রফি ক্যাবিনেটে নেই। সেই স্বপ্ন পূরণের শেষ সুযোগ হতে পারে এবারের টুর্নামেন্ট।
ইয়ামালের বার্তা, ‘এখনই আসল বিশ্বকাপ’
অন্যদিকে স্পেনের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল (Lamine Yamal) এই বিশ্বকাপে ধীরে ধীরে নিজের ছাপ ফেলতে শুরু করেছেন। হ্যামস্ট্রিং চোট কাটিয়ে শেষ ৩২-এর ম্যাচে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচসেরা পারফরম্যান্স করেন তিনি।
ইউরো ২০২৪ জয়ের অন্যতম নায়ক ইয়ামাল জানিয়েছেন, ‘আমরা প্রতিটি রাউন্ড পার হয়ে শিরোপা জিততে চাই। কোনও দলকেই ভয় পাই না। আমরা স্পেন। আসল বিশ্বকাপ এখন থেকেই শুরু।’
এই বিশ্বকাপে ইয়ামাল একটি গোল করেছেন। স্পেনের হয়ে সর্বোচ্চ চার গোল করেছেন মিকেল ওয়ারজাবাল (Mikel Oyarzabal)।
স্পেনের দুরন্ত রেকর্ড
স্পেন টানা ৩৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অপরাজিত। এই ম্যাচে হার এড়াতে পারলে ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে গড়া নিজেদের দীর্ঘতম অপরাজিত থাকার রেকর্ডের সমতায় পৌঁছে যাবে তারা। পাশাপাশি ২০১০ সালের পর দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্নও জিইয়ে রাখতে চাইছে স্প্যানিশরা।
পরিসংখ্যান কী বলছে?
অপ্টা (Opta)-র সুপারকম্পিউটারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে স্পেনের জয়ের সম্ভাবনা ৪৯.২ শতাংশ। পর্তুগালের সম্ভাবনা ২৫.৬ শতাংশ। আর ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর সম্ভাবনা ধরা হয়েছে ২৫.২ শতাংশ।
কোয়ার্টার ফাইনালে অপেক্ষায় কারা?
এই ম্যাচের বিজয়ী দল কোয়ার্টার ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্র (USA) অথবা বেলজিয়াম (Belgium)-এর মুখোমুখি হবে। সেই ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১০ জুলাই, লস অ্যাঞ্জেলেসে (Los Angeles)।
মুখোমুখি পরিসংখ্যান
বড় টুর্নামেন্টে দুই দলের পাঁচটি সাক্ষাতে একবার করে জিতেছে পর্তুগাল ও স্পেন। বাকি তিনটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে দুই দলের শেষ সাক্ষাৎ ৩-৩ গোলে ড্র হয়েছিল, যেখানে হ্যাটট্রিক করেছিলেন রোনাল্ডো।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৪১ বার মুখোমুখি হয়েছে দুই দেশ। এর মধ্যে স্পেন জিতেছে ১৮টি ম্যাচ, পর্তুগাল সাতটি এবং ১৬টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। তবে সর্বশেষ সাক্ষাতে ২০২৫ সালের উয়েফা নেশনস লিগ ফাইনালে টাইব্রেকারে জয় পেয়েছিল পর্তুগাল, যা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে নিঃসন্দেহে।
সোমবারের এই মহারণে তাই একদিকে অভিজ্ঞতার প্রতীক রোনাল্ডো, অন্যদিকে ভবিষ্যতের তারকা ইয়ামাল। শেষ পর্যন্ত কে হাসবে, তা জানতে এখন অপেক্ষা কেবল মাঠে ৯০ মিনিটের লড়াইয়ের।






