নজরবন্দি ব্যুরো: নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানের তিন দিন পরেও কাটেনি আতঙ্ক। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, বিপর্যস্ত এলাকায় এখনও প্রায় ৩২০ জন ভারতীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। এর মধ্যেই ৮৫ জন ভারতীয় পর্যটককে উদ্ধার করেছে নেপাল, আর শুক্রবার তামিলনাড়ুর ২১ জন নাগরিক নিরাপদে দিল্লিতে ফিরেছেন।
শুক্রবার বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সবাল (Randhir Jaiswal) জানান, উদ্ধারকাজ ও নিখোঁজদের সন্ধানে ভারতীয় ও নেপালি কর্তৃপক্ষের মধ্যে যোগাযোগ চলছে। বৃহস্পতিবার কাঠমান্ডুতে পৌঁছনো তামিলনাড়ুর ২১ জনকে শুক্রবার দিল্লিতে ফিরিয়ে আনা হয়। তাঁদের সঙ্গে দেখা করে পরিস্থিতির খোঁজ নেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (S. Jaishankar)।
এর পাশাপাশি, নেপালের বিপর্যস্ত এলাকা থেকে ৬৩ জন ভারতীয় কর্মীকেও উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁরা ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আরও ৯৬ জন ভারতীয়, যাঁরা মানস সরোবর যাত্রায় গিয়ে চিনের দিকে আটকে পড়েছিলেন, স্থলপথে নিরাপদে নেপালে ঢুকতে পেরেছেন বলে জানিয়েছে দিল্লি।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের (Nepal Tourism Board) শুক্রবারের হিসাবে, বন্যাকবলিত এলাকা থেকে মোট ১২১ জন বিদেশি পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৮৫ জন ভারতীয়, ১৬ জন চিনের, ৯ জন দক্ষিণ কোরিয়ার, ২ জন করে আমেরিকা, রাশিয়া ও ইতালির নাগরিক। এছাড়া বুলগেরিয়া ও সুইৎজ়ারল্যান্ডের এক জন করে নাগরিক উদ্ধার হয়েছেন। আরও তিন জনের জাতীয়তা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
এদিকে নেপালের বিপর্যয়ের ভয়াবহতা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (NDRRMA)-র শুক্রবার বিকেল ৩টে পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, ৫৩৮টি দেহ উদ্ধার হয়েছে এবং ৯৭৭ জন এখনও নিখোঁজ। উদ্ধার করা হয়েছে ৩,৭৪২ জনকে। বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মীকে নামানো হয়েছে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযানে।
বুধবার সকালে নেপালের রাসুয়া (Rasuwa) জেলার ভোটেকোশী নদীতে আচমকা ভয়াবহ হড়পা বান নেমে আসে। তিব্বত সীমান্তের কাছে শুরু হওয়া সেই প্রবল স্রোত পরবর্তী সময়ে নদীপথ ধরে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও গোরখা-সহ একাধিক এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সড়ক পরিকাঠামো ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকাজ এখনও অত্যন্ত কঠিন। বহু জায়গায় রাস্তা ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থলপথে পৌঁছনো যাচ্ছে না। ফলে সেনা ও বেসরকারি হেলিকপ্টারের সাহায্যে আটকে পড়া মানুষকে সরিয়ে নেওয়া এবং নিখোঁজদের খোঁজ চালানো হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে নেপালকে আরও সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। শুক্রবার নেপালের উদ্দেশে তৃতীয় দফায় ত্রাণ পাঠানোর প্রস্তুতি নেয় দিল্লি। ওই বিমানে প্রায় ১২-১৩ টন ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি মেডিক্যাল দল পাঠানোর কথাও জানিয়েছে ভারত।
ক্ষতিগ্রস্ত বেলি সেতু মেরামতির জন্য প্রযুক্তিবিদ পাঠানোর প্রস্তাবও দিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারত মনে করছে, সেতুটি দ্রুত মেরামত করা গেলে ত্রাণ ও উদ্ধারসামগ্রী নিয়ে যাতায়াত অনেক সহজ হবে। একই সঙ্গে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF)-র দল পাঠানোর প্রস্তাবও দিয়েছে ভারত। তবে এই প্রস্তাবের বিষয়ে নেপালের তরফে এখনও কোনও সম্মতি আসেনি। আন্তর্জাতিক উদ্ধার-সহায়তার প্রস্তাব নেপাল আপাতত নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর উপর নির্ভর করেই সামলাতে চাইছে বলে জানিয়েছে দেশটির বিদেশ মন্ত্রক।
হড়পা বানের পর আরও একটি বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে মৃতদেহ সংরক্ষণ নিয়ে। একের পর এক দেহ উদ্ধারের ফলে নেপালের মর্গ ও হাসপাতালগুলিতে জায়গার চাপ বাড়ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধারকাজ যত এগোচ্ছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে নেপালের এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে বহু পরিবার। বিশেষ করে ৩২০ জন ভারতীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ না হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে তাঁদের পরিজনদের মধ্যে। উদ্ধার হওয়া ভারতীয়দের দেশে ফেরানোর পাশাপাশি নিখোঁজদের সন্ধান এবং আটকে থাকা নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে আনাই এখন দিল্লির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।



