নেপাল বন্যায় মৃতের সংখ্যা ৭০০ ছাড়াল, মর্গে জায়গা নেই, শনাক্ত না হওয়া দেহ কবর দিচ্ছে প্রশাসন

মৃতের সংখ্যা ৭০০ ছাড়াতেই নতুন সঙ্কট নেপালে। চিতওয়ানে মর্গে জায়গা না থাকায় শনাক্ত না হওয়া ২২৯টি দেহ কবর দেওয়া শুরু হয়েছে DNA নমুনা ও পরিচয় নম্বর রেখে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নজরবন্দি ব্যুরো: ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত নেপালে মৃতের সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে, কিন্তু শেষ হয়নি দেহ উদ্ধারের কাজ। উল্টে তৈরি হয়েছে নতুন সঙ্কট—মর্গে আর জায়গা নেই, বহু দেহে পচন ধরেছে, ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। পরিস্থিতি সামলাতে চিতওয়ানে শনাক্ত না হওয়া শত শত দেহ কবর দেওয়া শুরু করেছে প্রশাসন। DNA নমুনা ও পৃথক শনাক্তকরণ নম্বর রেখে এই দেহগুলি সমাধিস্থ করা হচ্ছে, যাতে পরে পরিচয় মিললে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া যায়।

২৬ অগস্টের ভয়াবহ হড়পা বানের পর নেপালের একাধিক নদী উপত্যকা কার্যত মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। ২৯ অগস্টের NDRRMA-র হিসাবে মৃতের সংখ্যা ছিল ৬৭৫ এবং নিখোঁজ বা নিখোঁজ-সদৃশ অবস্থায় ছিলেন ২,৪২৬ জন। পরবর্তী আপডেটে মৃতের সংখ্যা আরও বেড়েছে। ফলে উদ্ধারকাজ চলার সঙ্গেই বাড়ছে মৃতদেহ শনাক্ত ও সংরক্ষণের চাপ।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে চিতওয়ানে। নেপালের সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, সেখানে নদী ও আশপাশের এলাকা থেকে ২৩৩টি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তার মধ্যে মাত্র চারটি দেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে; বাকি ২২৯টি দেহ হাসপাতাল ও অস্থায়ী হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছিল। জায়গার অভাবে এবং দীর্ঘক্ষণ সংরক্ষণ করতে না পারায় বহু দেহে পচন শুরু হয়।

পরিস্থিতি সামলাতে শনিবার থেকেই চিতওয়ান প্রশাসন শনাক্ত না হওয়া দেহগুলির সমাধিস্থ করার সিদ্ধান্ত নেয়। Bharatpur Metropolitan City-র দেবঘাট এলাকায় নির্দিষ্ট জায়গায় দেহগুলি কবর দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের বক্তব্য, এটি স্থায়ীভাবে পরিচয় মুছে ফেলার কোনও পদক্ষেপ নয়; বরং পচন ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এড়ানোর জন্য জরুরি ব্যবস্থা।

প্রতিটি দেহ কবর দেওয়ার আগে DNA নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিটি দেহের সঙ্গে আলাদা শনাক্তকরণ নম্বর ও নথি রাখা হচ্ছে। দেহের ছবি, শারীরিক বিবরণ, DNA নমুনা এবং কবরের অবস্থানের তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে পরে কোনও পরিবার নিখোঁজ আত্মীয়ের সন্ধান পেলে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়।

চিতওয়ানের মর্গগুলির সীমাবদ্ধতাই পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করছে। স্থানীয় রিপোর্ট অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে সেখানে প্রায় ৫০টি দেহ রাখার মতো মর্গ-সুবিধা রয়েছে, অথচ উদ্ধার হওয়া দেহের সংখ্যা তার কয়েক গুণ। ফলে হাসপাতালের পাশাপাশি অস্থায়ী হোল্ডিং সেন্টারেও দেহ রাখতে হয়েছে।

এই বিপর্যয়ের জেরে শুধু দেহ শনাক্তকরণ নয়, ফরেনসিক পরিকাঠামো নিয়েও বড় চাপ তৈরি হয়েছে। নেপাল সরকার দ্রুত ফরেনসিক ও DNA পরীক্ষায় বিশেষজ্ঞ সহায়তা চেয়েছে। ভারত থেকে ১১ সদস্যের বিশেষজ্ঞ টেকনিক্যাল দলও পাঠানো হয়েছে, পাশাপাশি মরচুরি ব্যবস্থাপনা ও দেহ শনাক্তকরণে সহায়তার প্রয়োজনের কথা জানিয়েছে কাঠমান্ডু।

এদিকে নেপালের বিপর্যয়ে ভারতীয়দের নিয়েও উদ্বেগ কাটেনি। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক (Ministry of External Affairs) জানিয়েছে, নেপালে ১০৮ জন ভারতীয় নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে এবং আগে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া প্রায় ৫০ জনের সঙ্গে ফের যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়েছে। তবুও ২৭৫-এর বেশি ভারতীয় নাগরিক এবং ১২৮ জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি এখনও নিখোঁজ বা যোগাযোগের বাইরে রয়েছেন।

অন্যদিকে, চিনের দিক থেকেও কিছুটা স্বস্তির খবর এসেছে। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত দু’দিনে ৫৯৮ জন ভারতীয় নিরাপদে চিন থেকে নেপালে প্রবেশ করেছেন। আরও প্রায় ৯০০ জন ভারতীয় এখনও চিনের দিকে রয়েছেন, তবে তাঁদের নিরাপদ এবং যোগাযোগযোগ্য বলে জানিয়েছে বিদেশ মন্ত্রক।

তবে নেপালের সামনে এখন শুধু নিখোঁজদের খোঁজার লড়াই নয়, মৃতদের পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়ারও কঠিন পরীক্ষা। নদীর স্রোতে বহু দেহ বহু দূরে ভেসে যাওয়ায় পরিচয় নির্ধারণ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। তাই DNA নমুনা, শনাক্তকরণ নম্বর এবং কবরের পূর্ণ নথি রেখে দেহ সমাধিস্থ করার এই ব্যবস্থা ভবিষ্যতে বহু পরিবারের কাছে তাঁদের প্রিয়জনের পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়ার শেষ আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন