পৃথিবী থেকে প্রায় ১৬০০ কোটি মাইল দূরে মহাকাশের গভীরে থাকা নাসার (NASA) মহাকাশযান ভয়েজার-১ (Voyager 1)-এর সঙ্গে হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। পরপর দু’দিন নির্ধারিত সময়ে মহাকাশযানটির কোনও রেডিও সিগন্যাল ধরতে পারেনি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থার বিজ্ঞানীরা। প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর, ২০ অক্টোবর নিজে থেকেই আবার সিগন্যাল পাঠাতে শুরু করে সৌরজগতের বাইরে থাকা এই মহাকাশযান। কেন এমন ঘটনা ঘটেছিল, তা এখনও খতিয়ে দেখছেন নাসার ইঞ্জিনিয়াররা। তবে স্বস্তির বিষয়, ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত নাসার সর্বশেষ বিবৃতি অনুযায়ী, যোগাযোগ ফেরার পর থেকে ভয়েজার-১-এর সঙ্গে সংযোগ বজায় রয়েছে।
ঘটনাটি সামনে এসেছে নাসার ২৯ অক্টোবরের একটি মিশন আপডেটের মাধ্যমে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ১৮ ও ১৯ অক্টোবর পরপর দু’টি নির্ধারিত যোগাযোগের সময় ভয়েজার-১-এর কোনও সংকেত পাওয়া যায়নি। দু’টি যোগাযোগ প্রচেষ্টার মধ্যে ব্যবধান ছিল ২৪ ঘণ্টা। এরপর ২০ অক্টোবর মহাকাশযানটির সিগন্যাল আবার পৃথিবীতে পৌঁছয়। উল্লেখযোগ্য বিষয়, নাসার বিজ্ঞানীরা কোনও নতুন নির্দেশ পাঠানোর আগেই যোগাযোগ ফিরে এসেছিল।
নাসার বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, ভয়েজার-১-এর একটি গ্রুপের থ্রাস্টার (Thruster) কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। এর পর মহাকাশযানটির স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে বিকল্প থ্রাস্টার চালু করে। এই ব্যবস্থাকে নাসার পরিভাষায় ‘ফল্ট প্রোটেকশন’ (Fault Protection) বলা হয়।
মহাকাশযানের কম্পিউটার কোনও যান্ত্রিক বা প্রযুক্তিগত সমস্যা শনাক্ত করলে এই ব্যবস্থা নিজে থেকেই সক্রিয় হয়। তখন মহাকাশযানকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে গিয়ে স্বাভাবিক কাজকর্ম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। যাতে পৃথিবী থেকে বিজ্ঞানীরা সমস্যাটি পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশ পাঠাতে পারেন। তবে থ্রাস্টার কেন বন্ধ হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও জানা যায়নি।
৪৯ বছরের পুরনো মহাকাশযান, কমছে বিদ্যুৎ উৎপাদন: ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল ভয়েজার-১। প্রায় পাঁচ দশক ধরে মহাকাশে ছুটে চলেছে এই মহাকাশযান। বর্তমানে এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১৬০০ কোটি মাইল দূরে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে (Interstellar Space) অবস্থান করছে। ঘণ্টায় প্রায় ৬১ হাজার কিলোমিটার গতিতে এগিয়ে চলেছে সেটি। মানুষের তৈরি কোনও মহাকাশযান এখনও পর্যন্ত এত দূরে পৌঁছতে পারেনি।
তবে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মহাকাশযানটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা কমছে। ভয়েজার-১ এবং তার যমজ মহাকাশযান ভয়েজার-২, দু’টিই প্লুটোনিয়ামের ক্ষয় থেকে উৎপন্ন তাপকে বিদ্যুতে রূপান্তর করে শক্তি পায়। নাসার হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর এই দুই মহাকাশযানের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৪ ওয়াট করে কমছে।
এই পরিস্থিতিতে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ভয়েজার-১-এর তিনটি যন্ত্র বন্ধ করে তার পরিবর্তে কম বিদ্যুৎ খরচ করে এমন তিনটি বিকল্প ব্যবস্থা চালু করেন বিজ্ঞানীরা। ‘বিগ ব্যাং’ (Big Bang) নামে পরিচিত এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে মহাকাশযানটির বৈজ্ঞানিক যন্ত্রগুলিকে আরও বেশি দিন সচল রাখা।
১৮ নভেম্বর ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁতে চলেছে ভয়েজার-১: নাসার হিসাব অনুযায়ী, আগামী ১৮ নভেম্বর ভয়েজার-১ পৃথিবী থেকে প্রায় ১৬.০৯ বিলিয়ন মাইল বা ২৫.৮৯ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে পৌঁছবে। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে এতটাই দূরে চলে যাবে মহাকাশযানটি যে, আলোর গতিতে কোনও রেডিও বার্তা সেখানে পৌঁছতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা সময় লাগবে। আবার সেখান থেকে উত্তর পৃথিবীতে ফিরে আসতেও লাগবে আরও ২৪ ঘণ্টা।
মহাকাশ বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই দূরত্বকে বলা হয় এক ‘লাইট ডে’ (Light-day)। কোনও মানবনির্মিত মহাকাশযানের ক্ষেত্রে এই প্রথম এমন দূরত্ব অতিক্রম করার নজির তৈরি হতে চলেছে। তবে এই মাইলফলক ছোঁয়ার ফলে মহাকাশযানটির কাজকর্মে কোনও তাৎক্ষণিক পরিবর্তন হবে না। বরং পৃথিবী থেকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘ অপেক্ষার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
উল্লেখ্য, ভয়েজার-১ ১৯৭৭ সালে ১০টি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের প্রয়োজনে কয়েকটি যন্ত্র বন্ধ করতে হয়েছে। বর্তমানে মহাকাশযানটি সৌরজগতের সীমানার বাইরের পরিবেশ, আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। এত দীর্ঘ সময় পরেও তার কাজ চালিয়ে যাওয়া মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক অসাধারণ সাফল্য।
তাই ৪৮ ঘণ্টার যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার ঘটনা আপাতত কাটলেও ভয়েজার-১-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে নাসার বিজ্ঞানীদের সতর্ক থাকতে হচ্ছে। ক্রমশ কমতে থাকা বিদ্যুৎ, পুরনো প্রযুক্তি এবং পৃথিবী থেকে বিপুল দূরত্ব—সব মিলিয়ে এই ঐতিহাসিক মহাকাশ অভিযানের প্রতিটি দিনই এখন গুরুত্বপূর্ণ।



