‘জন গণ মন’-এর পরিবর্তে ‘বন্দে মাতরম’কে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত করার দাবি তুলে নতুন বিতর্ক উসকে দিলেন অভিনেতা মুকেশ খান্না (Mukesh Khanna)। রবিবার এক সাক্ষাৎকারে ‘শক্তিমান’ খ্যাত অভিনেতা জানান, তিন বছর আগেও তিনি একই দাবি জানিয়েছিলেন। এবারও তাঁর বক্তব্য, দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ‘বন্দে মাতরম’-কেই বেছে নেওয়া উচিত। তাঁর মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক।
মুকেশের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন করে উত্তপ্ত। কংগ্রেস সদর দফতরে গানটি গাওয়ায় বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিজেপি এবং কংগ্রেসের মধ্যে চাপানউতোর চলছে। রবিবার রাজস্থানের চিত্তোরগড়ে সভা করে কংগ্রেসকে নিশানা করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)। সেই আবহেই মুকেশের মন্তব্য বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মুকেশ দাবি করেন, ‘জন গণ মন’ নাকি ব্রিটিশ রানি এলিজাবেথের প্রশংসা করে লেখা হয়েছিল। তিনি জানান, প্রায় তিন বছর আগে একই কথা বলেছিলেন এবং তখনও ‘বন্দে মাতরম’-কে জাতীয় সঙ্গীত করার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। অভিনেতার মতে, দেশের জাতীয় পরিচয় ও স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে ‘বন্দে মাতরম’-এর যে ঐতিহাসিক যোগ রয়েছে, তার ভিত্তিতেই গানটিকে জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দেওয়া উচিত।
তবে মুকেশের বক্তব্যের এই অংশটিই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে। কারণ ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore)-এর ‘জন গণ মন’ ১৯১১ সালে রচিত এবং ওই বছরের ২৭ ডিসেম্বর কলকাতায় কংগ্রেসের অধিবেশনে প্রথম গাওয়া হয়েছিল। ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদ ‘জন গণ মন’-কে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করে।
‘জন গণ মন’কে ব্রিটিশ সম্রাটের উদ্দেশে লেখা হয়েছিল—এই অভিযোগ বহু বছর ধরে বিতর্কের বিষয়। তবে সরকারি ও ঐতিহাসিক নথিতে ‘জন গণ মন’ এবং ১৯১১ সালের কংগ্রেস অধিবেশনে রাজা পঞ্চম জর্জকে স্বাগত জানিয়ে গাওয়া অন্য একটি গানের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও পরবর্তী সময়ে ‘জন গণ মন’-কে কোনও ব্রিটিশ সম্রাটের প্রশস্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করার বিরোধিতা করেছিলেন। ফলে মুকেশের সাম্প্রতিক বক্তব্যের ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
অন্যদিকে ‘বন্দে মাতরম’-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (Bankim Chandra Chattopadhyay) রচনা থেকে উঠে আসা এই গান স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত। ১৯৫০ সালে গণপরিষদের সিদ্ধান্তে ‘জন গণ মন’ জাতীয় সঙ্গীত এবং ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় গান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। একই সঙ্গে ‘বন্দে মাতরম’-কে ‘জন গণ মন’-এর সমান সম্মান দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল।
মুকেশ শুধু জাতীয় সঙ্গীতের প্রসঙ্গেই থেমে থাকেননি। ‘বন্দে মাতরম’-এর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত আবেগের কথাও জানিয়েছেন। কিংবদন্তি গায়িকা লতা মঙ্গেশকর (Lata Mangeshkar)-এর গাওয়া গানটির প্রশংসা করে তিনি জানিয়েছেন, সুরকার কল্যাণজি-আনন্দজির সঙ্গে এ নিয়ে তাঁর আলোচনা হয়েছিল। এমনকি ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রায় সাত মিনিটের একটি সংস্করণ রেকর্ড করার কথাও জানিয়েছেন অভিনেতা।
স্কুল এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার বিষয়ে সাম্প্রতিক উদ্যোগকেও স্বাগত জানিয়েছেন মুকেশ। বিশেষ করে গানটির পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ পরিবেশনের সিদ্ধান্তকে তিনি ইতিবাচক বলে মনে করছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘বন্দে মাতরম’-কে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন এবং গানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা উচিত।
‘বন্দে মাতরম’ বনাম ‘জন গণ মন’ বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। স্বাধীনতার পর জাতীয় সঙ্গীত বাছাইয়ের সময় দু’টি গানই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। ১৯৪৮ সালের নেহরু আর্কাইভের নথিতে দেখা যায়, তৎকালীন নেতৃত্বের আলোচনায় ‘জন গণ মন’ ও ‘বন্দে মাতরম’—দুই গানই বিবেচনায় ছিল। শেষ পর্যন্ত গণপরিষদের সিদ্ধান্তে ‘জন গণ মন’ জাতীয় সঙ্গীত এবং ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় গান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
মুকেশ খান্না এর আগেও একাধিক মন্তব্যের জন্য সংবাদ শিরোনামে এসেছেন। ‘শক্তিমান’ চরিত্রে রণবীর সিং (Ranveer Singh)-কে পছন্দ না করা থেকে শুরু করে কমেডিয়ান সময় রায়না (Samay Raina)-কে ঘিরে তাঁর প্রকাশ্য মন্তব্য—বিভিন্ন সময়ে তাঁর বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে এ বার বিষয়টি সরাসরি দেশের জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় বিতর্কের মাত্রা আরও বেশি।
বর্তমানে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ‘জন গণ মন’-এর সাংবিধানিক ও সরকারি স্বীকৃতি রয়েছে, আর ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় গান হিসেবে মর্যাদাপ্রাপ্ত। তাই মুকেশ খান্নার দাবি আপাতত তাঁর ব্যক্তিগত মত হিসেবেই সামনে এসেছে। সেই মত নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক যতই তীব্র হোক, জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পরিবর্তনের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত সরকারি ও সাংবিধানিক সিদ্ধান্তের বিষয়—এটাই বর্তমান বাস্তবতা।



