বিজেপি-র ‘অশ্বমেধের ঘোড়া’ আটকে রয়েছে মমতার বাংলায়, সেই ‘অধরা দ্বীপ’ দখলের চেষ্টায় আজ যা করলেন মোদি

মালদহের সভা থেকে মোদীর বার্তা—পূর্ব ভারত প্রায় বিজেপির দখলে, শুধু পশ্চিমবঙ্গে ‘অশ্বমেধের ঘোড়া’ আটকে। অনুপ্রবেশ, দুর্নীতি, উন্নয়ন ইস্যুতে তৃণমূলকে তোপ।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

পূর্ব ভারতে বিজেপির দাপট—কিন্তু মানচিত্রে এখনও একটি ‘অধরা দ্বীপ’ রয়ে গেছে! শনিবার মালদহের মঞ্চ থেকে সেই বার্তাই যেন আরও একবার স্পষ্ট করে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নির্বাচনের বছরে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম জনসভাতেই ‘আত্মবিশ্বাসী’ সুরে তিনি বুঝিয়ে দিলেন—এ বার লক্ষ্য একটাই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্যে আটকে থাকা বিজেপির ‘অশ্বমেধের ঘোড়া’কে বাধামুক্ত করা।

মোদীর বক্তব্যে উঠে আসে, পূর্ব ভারতের প্রায় সব রাজ্যেই বিজেপির সরকার রয়েছে—ওড়িশা থেকে অসম, ত্রিপুরা থেকে বিহার। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই সেই ‘সুশাসনের শৃঙ্খল’ সম্পূর্ণ হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ইঙ্গিত, দেশের ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘উন্নত ভারত’ গড়ার যে রোডম্যাপ, সেখানে পূর্ব ভারতের উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি—আর তার জন্য দরকার পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির ক্ষমতায় আসা।

“ঘৃণার রাজনীতির কব্জা থেকে মুক্ত করেছে বিজেপি”—মোদীর বার্তা

মালদহের সভায় প্রধানমন্ত্রী এক দিকে পূর্ব ভারতে বিজেপির দীর্ঘ লড়াইয়ের কথা স্মরণ করালেন, অন্য দিকে স্পষ্ট করলেন তাঁর রাজনৈতিক আক্ষেপও। তাঁর দাবি, বহু দশক ধরে ‘ঘৃণার রাজনীতি’ করা শক্তিরা পূর্ব ভারতকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, কিন্তু বিজেপি সেই রাজ্যগুলিকে ‘মুক্ত’ করেছে। মোদীর ভাষায়, এখন পূর্ব ভারতের মানুষের আস্থা যদি কোনও দলের উপর থাকে, তা হলে তা বিজেপির উপরই।

সিঙ্গুরে ‘শিল্প-রাজনীতি’ নিয়ে তোপ দাগার ইঙ্গিত

মোদীর বাংলা সফর এখানেই শেষ নয়। রবিবার তিনি সিঙ্গুরে সরকারি প্রকল্প উদ্বোধনের পাশাপাশি জনসভায় বক্তব্য রাখবেন। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, সিঙ্গুরের মঞ্চ থেকে টাটা-ন্যানো, শিল্পায়ন এবং রাজ্যে শিল্পে বাধা দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তৃণমূল সরকারকে আরও আক্রমণ করতে পারেন তিনি। মালদহের সভা শেষে প্রধানমন্ত্রী অসমে গিয়েছেন, গুয়াহাটিতে রাত্রিবাস করে ফের রবিবার পশ্চিমবঙ্গে ফিরবেন বলে জানা যাচ্ছে।

অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে তোপ, SIR বিতর্কের আবহে নতুন মাত্রা

পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর এবং ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যু নিয়ে যখন রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে, তখন মালদহের সভা থেকে অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে কড়া অবস্থান নিলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, বিশ্বের বহু উন্নত দেশও অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে—তাই পশ্চিমবঙ্গ থেকেও অনুপ্রবেশকারীদের তাড়ানো জরুরি।

মোদীর অভিযোগ, তৃণমূলের নেতা ও সিন্ডিকেট বছরের পর বছর ধরে অনুপ্রবেশকারীদের ঢোকানোর এবং তাদের ভোটার বানানোর ‘খেলা’ চালিয়েছে। তাঁর দাবি, এর ফলে গরিব মানুষের অধিকার খর্ব হচ্ছে, যুবসমাজের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, নারীদের নিরাপত্তা ও সম্মান বিপন্ন হচ্ছে, এমনকি সন্ত্রাস ছড়ানোর ক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে। শুধু জনবিন্যাস নয়, কিছু এলাকায় ভাষাগত পরিবর্তন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

মতুয়া-শরণার্থীদের আশ্বাস, CAA নিয়ে স্পষ্ট বার্তা

অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গ তুললেও শরণার্থী, মতুয়া এবং নমশূদ্র সমাজের মানুষদের উদ্দেশে আলাদা করে আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ধর্মীয় নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা শরণার্থীদের ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। তাঁর দাবি, সংবিধান তাঁদের ভারতে থাকার অধিকার দিয়েছে এবং সিএএ-এর মাধ্যমে ‘পূর্ণ নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করা হয়েছে।

বেলডাঙার অশান্তি ও মহিলা সাংবাদিক আক্রান্ত—তৃণমূলকে নিশানা

মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় চলতে থাকা অশান্তির প্রসঙ্গও পরোক্ষভাবে উঠে আসে মোদীর বক্তব্যে। মহিলা সাংবাদিক আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, এটি প্রমাণ করে পশ্চিমবঙ্গে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।

“চার দিকেই বিজেপির সরকার”—পশ্চিমবঙ্গে ‘শেষ ধাপ’ বার্তা

পূর্ব ভারতে বিজেপির শক্তিবৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে মোদী প্রথমে ওড়িশায় প্রথমবার বিজেপি সরকার গঠনের কথা বলেন। এরপর অসম ও ত্রিপুরায় একাধিকবার সরকার গঠনের উদাহরণ দেন। শেষে বিহারে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার গঠনের কথা উল্লেখ করে তিনি বার্তা দেন—পশ্চিমবঙ্গের চার দিকেই বিজেপির ‘সুশাসনের সরকার’ রয়েছে, এবার পশ্চিমবঙ্গেও সেই পালা।

যদিও বাস্তবে ঝাড়খণ্ডে এখনও অ-বিজেপি সরকার চলছে। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মোদী ইচ্ছাকৃতভাবেই ‘পূর্ব ভারত প্রায় সম্পূর্ণ’ বার্তাটি জোরালো করতে চেয়েছেন। কারণ সম্প্রতি ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর জল্পনা ছড়িয়েছে—তিনি এনডিএ-তে যেতে পারেন কি না।

মহারাষ্ট্র ও কেরলের উদাহরণ টেনে ‘অসম্ভব’ ভাঙার চেষ্টা

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গঠন যাতে ‘অসম্ভব কল্পনা’ বলে মনে না হয়, সেই উদ্দেশ্যে মোদী টেনে আনেন সাম্প্রতিক মহারাষ্ট্র পুরভোটের প্রসঙ্গ। তিনি দাবি করেন, মুম্বইয়ে প্রথমবার বিজেপির মেয়র হতে চলেছেন, কেরলের রাজধানী তিরুঅনন্তপুরমেও প্রথমবার বিজেপির মেয়র শপথ নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য—যেখানে আগে বিজেপির জয় অসম্ভব মনে হত, সেখানেও আজ বিজেপি অভূতপূর্ব সমর্থন পাচ্ছে। পাশাপাশি জেন-জ়ির বিজেপির উন্নয়নমূলক কাজের উপর ভরসার কথাও বলেন তিনি।

দুর্নীতি, প্রকল্প ‘লুট’ এবং কৃষকদের প্রসঙ্গ—মালদহে আক্রমণ তুঙ্গে

তৃণমূলকে দুর্নীতির অভিযোগে আক্রমণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আবাস যোজনা, নলবাহিত পানীয় জল, বিনামূল্যে রেশন-সহ বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা ‘লুট’ হয়েছে। মালদহে বন্যাত্রাণের নামে দুর্নীতির সিএজি রিপোর্টের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

এ ছাড়াও তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে আয়ুষ্মান ভারতে বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং ‘পিএম সূর্যঘর’ প্রকল্পে সোলার প্ল্যান্ট বসিয়ে বিদ্যুৎ বিল কমানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে।

মালদহের আমচাষি, রেশমচাষি এবং পাটচাষিদের উদ্দেশেও বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, রাজ্য সরকার চাষিদের উৎপাদনকে কাজে লাগানোর মতো উদ্যোগ নেয়নি—ফলে আর্থিক উন্নতিও হচ্ছে না। পাশাপাশি গঙ্গা, ফুলহার, মহানন্দার ভাঙন এবং প্রতি বছর বন্যা পরিস্থিতি নিয়েও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তোলেন তিনি।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত